পশ্চিমাঞ্চল ডেস্ক:
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বৃহত্তম, প্রাচীনতম এবং সবচে তৃণমূল সংলগ্ন রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে দু’টি পর্ব। বাংলাদেশ পূর্ব এবং বাংলাদেশ পরবর্তী। বাংলাদেশ পূর্ব আওয়ামী লীগের বিকাশ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে গিয়েছিল। জনগণও বঙ্গবন্ধুকে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ’৪৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রাম হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততায়। ’৬৪ ও ৬ দফার পর থেকে বঙ্গবন্ধু বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা হন। আওয়ামী লীগ বাঙালীর মুখপাত্র হয়ে গেল। এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের নির্মাণও শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। সামগ্রিক বিচারে এই দলটির কাছে বাঙালী এবং বাংলাদেশের অশেষ ঋণ। স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ায়ও নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু এবং তার কন্যা শেখ হাসিনা- এই দু’জনের কাছে,- এই পিতা-পুত্রীর কাছে আওয়ামী লীগের ঋণ, দেশের ঋণ ও জনগণের অশেষ ঋণ।
তবে, সাম্প্রতিককালে আওয়ামী লীগে বেশ কিছু বর্জনীয় এবং করণীয় আছে। আমি মনে করি, করণীর মধ্যে যেটা আছে- আওয়ামী লীগের মধ্যে মহীরুহ শেখ হাসিনার ছায়ার নীচে কোনো নেতৃত্ব গজায় নি এবং শেখ হাসিনা প্রায় ৪ দশক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আছেন। দেশের নেতৃত্বেও পর পর ৩ মেয়াদে তিনিই আছেন। এর আগেও ছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা এখন বিকল্পহীন নেতৃত্ব। শেখ হাসিনার পর কে নেতৃত্ব দেবে আওয়ামী লীগের? আমরা তো দৃশ্যমান কিছু দেখছি না। বঙ্গবন্ধু চৌষট্টিতে সভাপতি হয়ে নেতৃত্ব তৈরী করেছিলেন। যার ফলে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতেই জাতীয় ৪ নেতা সঠিক পথে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। সেই জাতীয় ৪ নেতা বঙ্গবন্ধুরই তৈরী। কিন্তু বর্তমান আমলে আওয়ামী লীগে তেমন নেতৃত্ব তৈরী হয় নি, এটা প্রথম কথা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে- বর্তমান আওয়ামী লীগে দল ও সরকার একাকার হয়ে গেছে,-যা বঙ্গবন্ধু করেন নি। সাতান্নতে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। ১৯৭৪ সালেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বড় দায়িত্ব ছেড়েছিলেন। দল এবং সরকার একাকার হওয়া অগণতান্ত্রিক। এভাবে দলও ভালো চলে না এবং সরকারও ভালো চলে না।

আরেকটি বর্জনীয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের আদর্শিক বিচ্যুতি। আদর্শিক বিচ্যুতি খুব বেশী হয়ে গেছে,- যা আমাদের মনোবেদনার কারণ। হেফাজতের সঙ্গে সখ্য এবং কওমী মাদ্রাসার সঙ্গে সখ্য,- রাজনীতির বিচারে কতটুকু বাস্তবসম্মত সেটার বিচার আওয়ামী লীগের থাকবে। যদিও তা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ, প্রগতিশীল বাংলাদেশের পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের স্বপক্ষে- তাদের কাছে এই সখ্য গ্রহণযোগ্য নয়। আরেকটি বর্জনীয়, পনেরতম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হচ্ছে- ইসলাম পরিপন্থী, গণতন্ত্র পরিপন্থী এবং বঙ্গবন্ধু পরিপন্থী। কারণ, বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে।

আমি মনে করি এই মুহূর্তে করণীয় এবং প্রত্যাশা হচ্ছে- আওয়ামী লীগ অনেক করেছে দেশের জন্য, মানুষের জন্য। কিন্তু তার মধ্যে আদর্শিক করণীয়টি বাদ পড়ে গেছে। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ার জন্য। শেষ কথাটি হলো- আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমার প্রত্যাশা, আওয়ামী লীগ যেন আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে।