ঘুরবে গণপরিবহনের চাকা, যাত্রীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে বিভিন্ন টার্মিনাল-রেলষ্টেশন-লঞ্চঘাট

দেশব্যাপী চলমান কঠোর বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ায় ১৯ দিন পর আজ থেকে সারাদেশের দোকানপাট ও বিপণিবিতান খুলছে। ঘুরবে গণপরিবহনের চাকাও। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুরোধে সরকার ঘোষিত টানা ৪০ দিনের বিধিনিষেধ শেষে আজ থেকে ফের চালু হচ্ছে গণপরিবহন। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত অবধি চুয়াডাঙ্গাসহ সারাদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটে বেড়াবে বাস, ট্রেন ও লঞ্চসহ নানান পরিবহন।

হাজার হাজার যাত্রীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে বিভিন্ন টার্মিনাল, রেলষ্টেশন ও লঞ্চঘাট। জনশুন্য শহর আবার হয়ে উঠবে মানুষের পদচারনায় মুখরিত। শ্রমিকের মুখে ফুটবে হাসি। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগের মতো স্বাভাবিক ভাড়ায় চলবে গণপরিবহন। এছাড়াও, দোকানপাট ও বিপণিবিতান ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে তদারকিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগের মতোই চালানো হবে অভিযান।

ঈদে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে আট দিনের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করে সরকার। তাতে ঈদের আগে ছয় দিন বেচাবিক্রির সুযোগ পান ব্যবসায়ীরা। অনেকে ঈদের দিন ও তার পরদিনও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখেন। ২৩ জুলাই থেকে আবার ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়। পরে সেটি ১০ আগষ্ট, অর্থাৎ গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছিলো।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি নেই। মৃত্যুর হার গতকালও ছিল সর্বোচ্চ। এরমধ্যেই বিধিনিষেধ (লকডাউন) শিথিল করে আজ থেকে সরকারী-বেসরকারী অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, শিল্প-কারখানাসহ প্রায় সবকিছু খোলা থাকবে। তবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পর্যটন, বিনোদন কেন্দ্র, রিসোর্ট বন্ধ থাকবে।

এদিকে লকডাউন শিথিল হওয়ার আগের দিন মঙ্গলবার দেশে করোনায় ২৬৪ জনের মৃত্যু হয়। এমন অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের পাশাপাশি সুশৃঙ্খলভাবে গণটিকা কার্যক্রম পরিচালনা করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিধিনিষেধ শিথিল করায় বাস, লঞ্চ ও ট্রেন সব আসনেই যাত্রী বহন করতে পারবে।

এক্ষেত্রে অর্ধেক সংখ্যক বাস চলাচলের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। মহামারী থাকলেও মানুষের জীবিকা রক্ষা ও অর্থনীতির কর্মকাণ্ড সচল রাখার তাগিদ রয়েছে সরকারের ওপর। সংকটে পরা বিভিন্ন পেশার মানুষও আর মানতে চাচ্ছে না বিধিনিষেধ। তাই জীবিকা ও অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিতে আপাতত লকডাউন থেকে সরে এসেছে সরকার।

এই প্রেক্ষাপটে মাস্ক পরাসহ কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে টিকা দেয়ার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলা করতে চাইছে সরকার। তবে, বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ করোনা মোকাবিলায় সরকারের এই কৌশলের সঙ্গে একমত নন। আবার কেউ কেউ বলছেন, আমাদের মতো দেশে বেশীদিন লকডাউন রাখা সম্ভব নয়।

তবে, স্বাস্থ্যবিধি মানানোর ক্ষেত্রে সফল হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। সরকার পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত দোকানপাট ও বিপণিবিতান সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১০ ঘণ্টা খোলা থাকবে। গত ৮ আগষ্ট মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ চলমান বিধিনিষেধে না বাড়ানো সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে জারী করা হয়।

এতে আরও বলা হয়েছে, খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁয় অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ১৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। বিধিনিষেধে খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ সীমিত সময়ের জন্য খোলা থাকলেও ভেতরে বসে খাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ক্রেতারা শুধু খাবার কিনে নিয়ে যেতে পারতেন।

শ্রমিকরা জানান, ৪০ দিন পর স্বাভাবিকভাবে কাজে ফিরে যেতে পারবে বলে তাদের আনন্দ হচ্ছে। এতদিন বিধিনিষেধে কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কেটেছে। বুধবার থেকে গণপরিবহনের চাকা ঘুরলে মজুরী পাবেন। সংসারের প্রায় থমকে যাওয়া চাকা আবার সচল হবে বলে মন্তব্য করেন শ্রমিকরা। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বিধিনিষেধ উঠে গেলেও দেশে এখনো করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমে নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন গণমাধ্যমে বলেন, কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট ও বিপণিবিতান খুলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।

এছাড়া সকল গণপরিবহনসহ লঞ্চের বাড়তি ভাড়া প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। প্রতিমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে সব ধরনের গণপরিবহনের ও লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। নতুন করে ভাড়া বাড়ছে না।

এদিকে, গতকল মঙ্গলবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ২৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৩ হাজার ১৬১ জনে। এই সময়ে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন আরও ১১ হাজার ১৬৪ জন। এ নিয়ে দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩ লাখ ৭৬ হাজার ৩২২ জনে।

দফায় দফায় লকডাউন: গত বছরের (২০২০) ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী প্রথম শনাক্ত হয়। পরিস্থিতি ক্রম অবনতির দিকে যেতে থাকলে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সবকিছু বন্ধ করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এরপর দফায় দফায় ছুটি বাড়তে থাকে। ওই বছরের ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ছিল। পরে ৩১ মে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে অফিস খুলে দেয়া হয়, চালু করা হয় গণপরিবহন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ফের উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় গত ৫ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা পর্যন্ত লকডাউন দেয় সরকার। তবে গণপরিবহন, মার্কেট খোলা রেখে এই লকডাউন ছিল অনেকটাই অকার্যকর। পরে, গত ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে আটদিনের কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়। ক’এক দফায় শিথিলতাও আনা হয় বিধিনিষেধে। শেষে গত ২৩ জুলাই থেকে ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। গত ৫ আগষ্ট থেকে আরও পাঁচদিন বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ানো হয়। যা গতকাল মঙ্গলবার রাত ১২টায় শেষ হয়েছে সেই বিধিনিষেধ।