পশ্চিমাঞ্চল মনিটর: ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্বর্ণ যুগের অন্যতম অভিনেতা ও বলিউডের কিংবদন্তী খ্যাত দিলীপ কুমার মারা গেছেন। গতকাল বুধবার ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টায় মুম্বইয়ের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। শ্বাসকষ্ট নিয়ে হিন্দুজা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। শেষ সময়ে স্ত্রী সায়রা বানু পাশে ছিলেন তাঁর।
বিগত দীর্ঘ দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন দিলীপ কুমার। মুম্বইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি ছিলেন। গত ৩০ জুন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ভারতীয় চলচ্চিত্র তার স্বর্ণ যুগের অন্যতম কিংবদন্তী দিলীপ কুমারকে মনে রাখবে তাঁর অভিনীত ‘দেবদাস’, ‘মুঘলে আজম’, ‘গঙ্গা যমুনা’, ‘রাম অউর শ্যাম’ থেকে শুরু করে ‘মধুমতী’, ‘ক্রান্তি’, ‘শক্তি’ ও ‘মাশাল’-এর মতো জনপ্রিয় ছায়াছবির জন্য।
যেভাবে পেশওয়ারের ইউসুফ খান বলিউডের নায়ক দিলীপ কুমার হয়েছিলেন- বর্ষীয়ান ভারতীয় অভিনেতা দিলীপ কুমারের আসল নাম ইউসুফ সারোয়ার খান। তার বাবার নাম ছিলো মোহাম্মদ সারোয়ার খান, যিনি একজন ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। কৈশোরে মুম্বাই থেকে পুনে গিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য পরিচালিত একটি ক্যান্টিনে কাজ নেন ইউসুফ খান। এর কিছুদিন পর আবারও মুম্বাইয়ে (তৎকালীন বোম্বে) ফিরে বাবার সঙ্গে ব্যবসায় যোগ দেন তিনি। ব্যবসার কাজেই একসময় ইউসুফ খানের পরিচয় হয় সেসময়কার প্রখ্যাত সাইকোলজিস্ট ডা. মাসানির সঙ্গে, যিনি তাকে পরিচয় করিয়ে দেন ‘বোম্বে টকিজ’ এর মালিকের সঙ্গে।
তাদের সূত্রে দেখা হল এক ক্যান্টিন কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে। সেনাবাহিনীর ক্লাবের কাছে একটি স্যান্ডউইচের দোকান খুললেন ইউসুফ। ইংরেজি ভাল বলতে আর লিখতে পারতেন। ব্যবসা দাঁড় করাতে সময় নিলেন না। ১৯৪৩ সালে ‘বোম্বে টকিজ’ ইউসুফ খান যান চাকরি খুঁজতে, কিন্তু সেখানকার স্বত্বাধিকারী দেবিকা রানী তাকে অভিনেতার হওয়ার প্রস্তাব দেন। তার সিনেমার নাম বদলে দিলীপ কুমার রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিজের আত্মজীবনীতে এই বিষয় নিয়ে লিখেছেন অভিনেতা। তিনি জানান, প্রথমে দেবিকা রানিই তাকে নাম বদলানোর পরামর্শ দেন। বলিউডে তার অভিষেকের আগে এমন একটি নাম তাকে নিতে বলেন যে নামে দর্শক তাকে চিনবে। স্ক্রিনে তার রোম্যান্টিক আন্দাজের সঙ্গে মিলিয়ে ‘দিলীপ কুমার’ নামটি তিনিই পছন্দ করেন।
সায়রা বানুকে বিয়ের সময় দিলীপকুমারের বয়স ছিল ৪৪ বছর। সায়রা বানু ছিলেন ঠিক অর্ধেক, মাত্র ২২ বছর। পরে সায়রা বানু একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি ১২ বছর বয়স থেকেই দিলীপকুমারের অন্ধ ভক্ত ছিলেন।
তবে, নাম পরিবর্তন করার পেছনে একটি প্রধান কারণ ছিলো বাবা-মায়ের হাত থেকে বাঁচা। দিলীপ কুমার নিজের আত্মজীবনীতে লেখেন, তার বাবা অভিনয় পেশার একেবারে বিরোধী ছিলেন। এসব ‘নাটক’ মনে হত তার। উপরন্তু বন্ধুপুত্র রাজ কাপুর অভিনয়ে পা রাখায় আরোই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন তিনি।
মাসানি তাকে নিয়ে গেলেন বম্বে টকিজ-এ। প্রথম দিকে ইউসুফ ছবির গল্প বাছাই এবং চিত্রনাট্য লেখার কাজে সাহায্য করতেন। খুব ভাল জানতেন উর্দু। ফলে নিজের কাজে সুনাম অর্জন করতে সমস্যা হল না। এক সাক্ষাৎকারে দিলীপ কুমার জানিয়েছিলেন, বাবা-মায়ের হাত থেকে বাঁচার জন্যই এই কাণ্ড করেছিলেন তিনি। তবে পরে অবশ্য বাবা মেনে নিয়েছিলেন ছেলের পছন্দ। শিগগিরই অভিনয় ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন দিলীপ কুমার। ১৯৪৪ সালে মুক্তি পায় দিলীপ কুমারের প্রথম ছবি ‘জোয়ার ভাটা’। প্রথম দিকে দিলীপ কুমারের কয়েকটি ছবি ব্যবসাসফল ছিলো না। পরিচালক-প্রযোজক অনুরোধ করেন দিলীপকুমারকে। তিনি যেন কথা বলেন মধুবালার বাবার সঙ্গে। দিলীপকুমারের অভিযোগ ছিল, মধুবালার বাবা তাকে অপমান করেছেন। ১৯৬০ সালে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা ‘মুঘল এ আজম’ দিলীপ কুমারের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ‘জোয়ার ভাটা’, ‘আন’, ‘আজাদ’, ‘দেবদাস’, ‘আন্দাজ’, ‘মুঘল ই আজম’, ‘গঙ্গা যমুনা’, ‘ক্রান্তি’, ‘কর্মা’, ‘শক্তি’, ‘সওদাগর’, ‘মশাল’ সহ ৫০-এর বেশি বলিউড ছবিতে কাজ করেছেন এ কিংবদন্তি অভিনেতা।
অন্য দিকে মধুবালার বক্তব্য ছিল, দিলীপকুমারের কাছে অপমানিত হয়েছেন তার বাবা আতাউল্লাহ খান। তিনি তার বাবার বিরুদ্ধাচারণ করতে পারেননি। মধুবালার কথায় আতাউল্লাহর কাছে ক্ষমা চাননি দিলীপকুমার। চাপানউতোরের জেরে ভেঙে যায় দিলীপকুমার-মধুবালা প্রেম।
তপন সিনহা পরিচালিত বাংলা ছবি ‘সাগিনা মাহাতো‘তে দিলীপ কুমার অভিনয় করেছিলেন। এই কালজয়ী ছবিতে তার নায়িকা ছিলেন স্ত্রী সায়রা বানু। আটবার তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার জয় করেছেন। হিন্দি সিনেমাজগতের সবচেয়ে বড় সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে‘ পুরস্কারেও তাকে সম্মানিত করা হয়। ২০১৫ সালে সরকার দিলীপ কুমারকে দেশের দ্বিতীয় বড় সম্মান ‘পদ্মভূষণ’- এ সম্মানিত করে।