ঢাকায় ঠাঁই নেই, বাইরের হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ফাঁকা

ঢাকা প্রতিনিধি :করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের ৭৫ শতাংশেরও বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের। গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যু হয়। সোমবার (৫ এপ্রিল) পর্যন্ত করোনায় মোট মৃত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩১৮ জনে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক (পাঁচ হাজার ৩৪৪ জন) ঢাকা বিভাগে (৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ) এবং চট্টগ্রাম বিভাগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৮০ জন (১৮ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ) রোগীর মৃত্যু হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের ৪০ জনই ঢাকা বিভাগের এবং সাতজনের চট্টগ্রাম বিভাগে। আক্রান্তের হারও এই দুই বিভাগে সর্বোচ্চ।

আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের জন্য আইসিইউ শয্যা অত্যাবশ্যক হলেও যে দুটি বিভাগে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি সেখানে আইসিইউ শয্যার প্রকট সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অর্ধশত শয্যাও খালি নেই। বর্তমানে এ দুটি বিভাগে আইসিইউ শয্যা ফাঁকা রয়েছে মাত্র ৪৮টি (সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ঢাকায় ২৫টি ও চট্টগ্রামে ২৩টি)।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক মাস আগে গত ৫ মার্চ রাজধানীসহ সারাদেশে মোট ৫৬৬টি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি ছিলেন মাত্র ১৮৭টিতে। ফাঁকা ছিল ৩৭৯টি আইসিইউ বেড। এক মাসের ব্যবধানে বর্তমানে ঠিক উল্টো চিত্র। রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মুমূর্ষু করোনা রোগীর চিকিৎসার ৫৯৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৪২৪টি রোগী ভর্তি রয়েছে। ফাঁকা আইসিইউ শয্যার সংখ্যা মাত্র ১৭৪টি। ফাঁকা আইসিইউ শয্যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় মাত্র ২৫টি ও চট্টগ্রামে ২৩টি। অন্যান্য বিভাগে ১২৩টি শয্যা ফাঁকা রয়েছে।

রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীদের জন্য অনেকে খোঁজাখুঁজি করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানীর ১০টি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের মধ্যে উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের ১৬টি আইসিইউ শয্যার ১৬টিতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ১৬টি শয্যার ১৬টিতে, ৫০০ শয্যার কুর্মিটোলা হাসপাতালের ১০টি শয্যার ১০টিতে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০টি শয্যার ১৯টিতে, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের ছয়টির সবগুলোতে, মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ১৯ শয্যার ১৭টিতে, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের ১৬টির সবগুলোতে রোগী ভর্তি রয়েছে। আর রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের ১৫টির মধ্যে ১৫টিতে রোগী ভর্তি রয়েছেন এবং শহীদ সোহরোওয়ার্দী হাসপাতালের ১০টির মধ্যে দুটিতে রোগী আছেন। সরকারি হাসপাতালে দুই হাজার ৫৫৫টি সাধারণ শয্যায় এ মুহূর্তে রোগী ভর্তি দুই হাজার ৩৫৪ জন।

অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ১৮০টি শয্যায় রোগী ভর্তি ১৬৬টিতে। আইসিইউ শয্যা ফাঁকা মাত্র ১৪টি। নয়টি হাসপাতালের মধ্যে ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ণ হাসপাতালের ২২টি আইসিইউ বেডের ২২টিতে, আসগর আলী হাসপাতালে ১৮টির ১৮টিতে, স্কয়ার হাসপাতালের ১৯টির ১৬টিতে, ইবনে সিনা হাসপাতালের সাতটির সবগুলোতে, ইউনাইটেড হাসপাতালের ২১টির ১৯টিতে, এভার কেয়ার হাসপাতালের ৪০টির ৩৪টিতে, ইমপালস হাসপাতালের ৫২টির ৫২টিতে, এ এম জেড হাসপাতালের ১০টির আটটিতে, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালর ১০টির আটটিতে এবং বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের নয়টির নয়টিতেই রোগী ভর্তি রয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মোট তিন হাজার ৩২৭জনের মধ্যে দুই হাজার ৯৮১ জন ভর্তি রয়েছেন।

এছাড়া, চট্টগ্রামে মোট ৫১টি আইসিইউর মধ্যে ফাঁকা রয়েছে ২৩টি। অবশিষ্ট ২৮টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে। চট্টগ্রামে সরকারি পর্য়ায়ে ২৫টি শয্যার মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০টির মধ্যে দুটিতে অর্থাৎ ৮টি বেড ফাঁকা রয়েছে। এছাড়া ২চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ১০টির ১০টিতেই রোগী ভর্তি রয়েছে।

বেসরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ১৬টির ১৬টিতে, চট্টগ্রাম হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের ১০টি আইসিইউ বেডের ১০টিই ফাঁকা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৬৬৭টি সাধারণ শয্যার মধ্যে ৩৫৩টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের অন্যান্য বিভাগের হাসপাতালে মোট পাঁচহাজার ৫৮৭টি সাধারন শয্যা ও ২৩৯টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ শয্যায় মাত্র এক হাজার ১৫০ জন ও আইসিইউতে ১১৩ জন ভর্তি রয়েছে অর্থাৎ অন্যান্য বিভাগে এখনও চার হাজার ৪৩৭টি সাধারণ শয্যা এবং ১২৬টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা রয়েছে।

সার্বিকভাবে সারাদেশে মোট ৯ হাজার ৫৮১টি সাধারণ শয্যায় বর্তমানে চার হাজার ৪৮৪ জন ও ৫৯৮টি আইসিইউর মধ্যে ৪২৪টিতে রোগী ভর্তি রয়েছেন। এ হিসেবে সাধারণ শয্যা পাঁচ হাজার ৯৭টি ও আইসিইউ ১৭৪টি ফাঁকা রয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিন যেভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তা অব্যাহত থাকলে আর সপ্তাহখানেক পর আইসিইউতে রোগী ভর্তি করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএস এম আলমগীর হোসেন বলেন, করোনা রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আইসিইউসহ নানা সুযোগ থাকলেও মানুষ রাজধানীর হাসপাতালে ভিড় করছে। ফলে আইসিইউ ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠেছে।