পশ্চিমাঞ্চল রিপোর্ট :ফুড ভ্যালু চেইন নিশ্চিতকরণে দেশে আবাদযোগ্য প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর পতিত জমিতে ফসল চাষের উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। রোববার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে ফুড ভ্যালু চেইন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এই পরামর্শ দেন। ওয়েবিনারে কৃষিমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন।

পতিত জমিতে ফসলের চাষের উদ্যোগ ছাড়াও ওয়েবিনারে কৃষি পণ্যের বহুমুখীকরণে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ, প্রয়োজনীয় আর্থিক গ্রহণ, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মান রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহের সক্ষমতা বাড়ানো, কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি, কৃষিবিষয়ক শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের সমন্বয় বাড়ানো, উদ্ভাবন এবং নতুনবাজারের জন্য বেসরকারি খাতের ও বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের দেশের ফুড ভ্যালু চেইনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, মূলধন স্বল্পতা, পণ্য সংরক্ষণের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, পণ্য বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের দক্ষতার অভাব প্রভৃতি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’ তিনি বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসনে দেশে আবাদযোগ্য প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর পতিত জমিতে ফসল চাষের উদ্যোগ গ্রহণ, বিশেষায়িত কৃষি পণ্যের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সরবরাহ নিশ্চিতকরণের দাবি জানান।

ডিসিসিআই সভাপতি প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতি প্রণোদনা প্রদান, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা, গুণগত মান রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিএসটিআইসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের কৃষি পণ্য উৎপাদনকারী ও পক্রিয়াজাতকারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং নতুনবাজারের জন্য বেসরকারি খাতের ও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

কৃষিমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের মানুষের পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিতকরণে অঙ্গীকারাবদ্ধ।’ তিনি কৃষি খাতে আধুনিকায়নে খরচ কমাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোরারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের মূল্য সংযোজন নিশ্চিকরণের মাধ্যমে দেশের কৃষি খাতকে লাভজনক খাতে পরিণত করা সম্ভব।’ এ ছাড়া তিনি কৃষি খাতে আরও বেশি হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন আরও বৃদ্ধি প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন।

কৃষিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬০ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদিত হচ্ছে, তবে ভুট্টা থেকে উৎপাদিত পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে আরও বেশি দামে ভোক্তাদের কাছে এ ধরনের পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। যার মাধ্যমে আমাদের কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।’

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বাংলাদেশে কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এ ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি জানান, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকে আরও সম্প্রসারণের জন্য কৃষি প্রক্রিয়াজাত সেন্টার এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি ল্যাবরেটরির জন্য পূর্বাচলে দুই একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ কাজে সরকারকে সহযোগিতার লক্ষ্যে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি ।

মন্ত্রী বলেন, ‘কৃষকদের পণ্যের ভালো দাম নিশ্চিত করতে হলে ভ্যালু চেইন বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই।’ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাধারণত আমন ধান চাষ হলেও সম্প্রতি সেখানে মাঁচায় তরমুজের চাষ হচ্ছে, যা অত্যন্ত লাভজনক এবং এ ধরনের কৃষি কাজে কৃষকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ওয়েবিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলোজি অ্যান্ড রুরাল ইন্ডাস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম বোরহান উদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘কৃষিভিত্তিক ফুড ভ্যালু চেইনে মূলত চারটি বিষয় জড়িত। সেগুলো হলো ইনপুট, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ভোক্তাদের মধ্যে তা বিতরণ নিশ্চিতকরণ।’

তিনি জানান, সারা পৃথিবীতে মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের মৎস্য খাত অন্যতম এবং প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৪২.৭৭ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। যেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চিংড়ির উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৫৪ লাখ টন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পোল্ট্রি খাত গ্রামীণ পর্যায়ে জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দারিদ্র বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এ খাতের বিকাশে আরো প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি সহায়তা প্রয়োজন।’

ওয়েবিনারে আরো বক্তব্য রাখেন ইউনিমার্ট-ইউনাইটেড গ্রুপের পরিচালক মালিক তালহা ইসমাইল বারী, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসিং অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি মো. ইকতাদুল হক, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স) উজমা চৌধুরী, কারন্যাল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. সালেহ আহমেদ এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এর সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ।