ডিপ্লোম্যাটে প্রধানমন্ত্রীর নিবন্ধ
ঐক্যবদ্ধ না হলে জলবায়ু যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত

 

পশ্চিমাঞ্চল অনলাইন ডেস্কঃউন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে অবিলম্বে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা আশা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ সম্মাননা জয়ী শেখ হাসিনা ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘প্রকৃতির রুদ্ররোষের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না হলে আমাদের পরাজয় নিশ্চিত। যে প্রকৃতি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, খুব সচেতনভাবে আমরা তাকে ধ্বংস করে চলেছি।’ খবর বিডিনিউজের।

তিনি লিখেছেন, ‘গ্রেটা থুনবার্গ অথবা বাংলাদেশের কোস্টাল ইয়ুথ অ্যাকশন হাবের তরুণ পরিবেশকর্মীদের জন্য আমরা কোন পৃথিবী রেখে যাব? তাদের ভবিষ্যৎ আমরা জলাঞ্জলি দিতে পারি না।’

শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা ৪৮ উন্নয়নশীল দেশের জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) নেতা। এ বছরের শেষে গ্লাসগোতে ২৬তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ২৬) সম্মেলনকে অর্থবহ করতে সিভিএফ-কপ২৬ ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নিবন্ধের শুরুতেই শেখ হাসিনা স্মরণ করেছেন ২০২০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার কথা। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলডা হাইন ২০১৯ সালে ঢাকায় এসেছিলেন অভিযোজন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে। সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে শেখ হাসিনা ছিলেন সেই সম্মেলনের কো-চেয়ার।

যেসব উন্নত দেশ সবচেয়ে বেশি দূষণ ঘটাচ্ছে, সেসব দেশকে সেই সম্মেলন থেকে তারা সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির যে মাত্রা, তার তুলনায় বিশ্বের নেওয়া অভিযোজন পদক্ষেপ নিতান্তই অপ্রতুল। কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে, যাদের কেউ আশ্রয় দিতে চায় না।

শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমরা তাদের হুঁশিয়ার করে বলেছিলাম, প্রকৃতির রোষ থেকে সুরক্ষার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা কোনো দেশ বা কারও নেই।’

প্রধানমন্ত্রী নিবন্ধে বলেন, সেই সম্মেলনে হিলডা হাইন যখন বাংলাদেশকে সিভিএফের পরবর্তী সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব করলেন, তখন তার মনে হয়েছিল, জলবায়ু সংকটে বিশ্ব যেখানে পৌঁছেছে, আর অভিযোজনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সাফল্য দেখিয়েছে, তাতে সিভিএফের নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশের দায়িত্ব।

২০০৯ সালে মালদ্বীপের নেতৃত্বে বাংলাদেশসহ ১০টি দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করা সিভিএফ এখন বিশ্বের শতকোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে।

শেখ হাসিনা লিখেছেন, বাংলাদেশকে বলা হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ‘গ্রাউন্ড জিরো’। এ দেশের বহু মানুষের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মানে অস্তিত্বের সংকট। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ তার জিডিপির ২ শতাংশ হারায়; এই শতকের শেষে তা পৌঁছাবে ৯ শতাংশে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা এভাবে বাড়তে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১৭ শতাংশ চলে যাবে পানির নিচে, তাতে বাস্তুচ্যুত হবে তিন কোটি মানুষ।

তিনি লিখেছেন, ‘ইতোমেধ্যে ৬০ লাখ বাংলাদেশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুহারা হয়েছে। তারপরও আমরা ১০ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করে চলেছি, আর সে জন্য আমাদের পরিবেশগত মূল্যও চুকাতে হচ্ছে। এর ক্ষতিপূরণ আমাদের কে দেবে?’

শেখ হাসিনা লিখেছেন, বাংলাদেশসহ যেসব দেশ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সদস্য, জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে কম। তাই জলবায়ু অবিচার বন্ধের জন্য উদ্যোগী হওয়ার সময় এসেছে এখন।

তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশকে একটি কঠিন সময়ে সিভিএফের নেতৃত্ব নিতে হয়েছে। ২০২০ সালে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার খুব কাছে পৌঁছে গেছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলো ২০২০ সালের শেষ সময়ের আগে তাদের ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশনস-আইএনডিসিএস’ (উষ্ণায়ন কমাতে পরিবেশগত কার্যক্রমের রূপরেখা) হালনাগাদ করতে হিমশিম খাচ্ছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র কয়েক বছর ধরেই জলবায়ু সহযোগিতাকে কম গুরুত্ব দিয়ে আসছিল।

প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, প্যারিস সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়নের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে তহবিল পাওয়া গেছে অনেক কম। জি-টোয়েন্টিভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের মোট কার্বন গ্যাস নিঃসরণের ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী। তবে তারা জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। আর তার মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এলো কভিড-১৯ মহামারি। তাতে জলবায়ু, স্বাস্থ্য আর প্রকৃতির ত্রিমুখী সংকটে পড়ল বিশ্ব।

শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমি হুঁশিয়ার করেছিলাম, বলেছিলাম জলবায়ু সংকট আসলে বিশ্বের জন্য একটি জরুরি পরিস্থিতি, শেষ পর্যন্ত কঠোর বাস্তবতা সেই জরুরি বিষয়টি বুঝতে বিশ্বকে বাধ্য করল।’

২০২০ সালে খুব বেশি আইএনডিসিএস এলো না, কপ২৬ স্থগিত হয়ে গেল। শেখ হাসিনা তাই সিভিএফ নেতাদের সম্মেলন ডাকলেন, বিশ্ব নেতৃত্বকে বললেন, নেতার ভূমিকায় এখন ব্যর্থ হলে চলবে না, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বর্ধিত ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশন’ ঘোষণা করুন। বাস্তবিক অর্থে এটা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়সীমা।

সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৬০টি দেশ তাদের (কার্বন নিঃসরণ কমানোর) হালনাগাদ রূপরেখা (আইএনডিসিএস) জমা দিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি ছিল উল্লেখযোগ্য। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরার সিদ্ধান্তও উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু ওই সময়সীমার মধ্যেও যারা বর্ধিত আইএনডিসিএস জমা দেননি, তাদের প্রতি আমার আহ্বান, কপ২৬-এর আগেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।

শেখ হাসিনা বলেন, পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন বাংলাদেশসহ সিভিএফের সদস্য দেশগুলোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে তাদের ক্রমাগত সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে। জলবায়ু যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য আমার দর্শন হলো- ‘নিজেকে সাহায্য কর’। কেউ এসে বাঁচাবে, সেজন্য অপেক্ষা করো না। আমরা বসে থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আমাদের ছেড়ে দেবে না।

আর সেজন্য বাংলাদেশে অভিযোজন ক্ষমতা ও টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়াতে স্থানীয় তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা নিবন্ধে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে, যা জিডিপির ২.৫ শতাংশ।

ঢাকায় গ্লোবাল সেন্টার ফর অ্যাডপটেশনের আঞ্চলিক অফিস করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী নিবন্ধে লিখেছেন, এই কার্যালয় ইতোমধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব জোরদারে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।

তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশ ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি দশক’ ঘোষণা করে সিভিএফের সদস্য দেশগুলোকে ‘জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ নিতে বলেছে। কিন্তু নিজেদের চেষ্টায় সিভিএফ কতটুকুই বা করতে পারবে। অভিযোজনেরও তো একটা সীমা আছে! সেজন্য সিভিএফ-কপ২৬ শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নভেম্বরে জলবায়ু সম্মেলনে আমরা ঢাকা-গ্লাসগো-সিভিএফ-কপ২৬ ঐক্যের ঘোষণা চাই।

সেই সম্মেলনের আগে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর রূপরেখা চাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় করারও আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *