চুয়াডাঙ্গা জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৪ জন সহ উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেন ৭ জন : নতুন শনাক্ত ৯৪

স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গায় করোনা ভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যদিও ভয় নয়, করোনা ভাইরাস জয়ের উপায় সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যথাসময়ে পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়া। এতে ঘাটতি রয়েছে বলেই চুয়াডাঙ্গায় বেড়েছে মৃত্যু। গতকাল বৃহস্পতিবারও জেলায় করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ ৪জন এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও ৩ জন। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসেবে জেলায় মৃতের সংখ্যা ৯৪ হলেও বেসরকারি তথ্য মতে এ সংখ্যা ক’দিন আগেই একশ ছাড়িয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন ৯৪ জন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জীবননগরের হরিহরনগরের অবস্থা খুবই খারাপ। একই গ্রামে যেনো গণহারে সংক্রমিত হয়েছে। মোট আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ২০ জন।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসারসূত্রে জানা গেছে, জেলা শহরের জিনতলা মল্লিক পাড়ার মৃত কুদরত আলী খানের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা খান বেশ কিছুদিন ধরে সর্দি কাশি জ¦রে ভুগছিলেন। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। ২৩ জুন পরীক্ষার রিপোর্টে কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়। তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ২৯ জুন মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে রেডজোনে ভর্তি করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে ৭০ বছর বয়সী মোস্তফা খান ওরফে মোস্তফা খান মারা যান। স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাষ্ট্রীয় মর্যদা শেষে দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। মোস্তফা খান বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চুয়াডাঙ্গা জেলা ইউনিটের সাবেক ডেপুটি কমান্ডারর ছিলেন। শহরতলী দৌলাতদিয়াড়ের আহমদ আলীর স্ত্রী রিতা সর্দি কাশি জরে আক্রান্ত হন। গত ২১ জুন তাকে সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। হলুদ জোনে ভর্তি করে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। ২৭ জুন তিনি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী হিসেবে শনাক্ত হন। রেডজোনে নেয়া হয়। বুধবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে মারা যান ৪৫ বছর বয়সী রিতা। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যবিভাগ।

এদিকে চুয়াডাঙ্গা পলাশপাড়ার মৃত আলী আকবর খাঁর ছেলে একরামুল হক সর্দি কাশি জরে ভুগছিলেন। তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। করোনা পরীক্ষা করে পজিটিভ হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে গত ২৬ জুন নেয়া হয় ঢাকার মহাখালী ডিএনসিসি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মারা যান ৫০ বছর বয়সী একরামুল হক। তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের কোর্টমোড় এলাকার একে টের্ডাসের স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন। তার স্ত্রীও করোনা আক্রান্ত ছিলেন। তাকেও ঢাকায় নেয়া হয়। তবে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি বাড়ি ফিরলেও সুস্থ হয়ে আর বাড়ি ফিরলেন না একরামুল। একরামুলের অপর নিকটাত্মীয় চুয়াডাঙ্গা সরোজগঞ্জ ধুতুরহাটের মোস্তাফিজুর রহমান টুটুলও করোনা আক্রান্ত হন। তাকেও প্রথমে সদর হাসপাাতালে নেয়া হয়। ২৯ জুন তাকেও নেয়া হয় ঢাকাস্থ একই হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনিও। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ৩৮ বছর বয়সী মোস্তাফিজুর রহমান টুটুলও মারা গেছেন। ধুতুরহাটের মৃত ওয়াজ বক্সের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান টুটুল চুয়াডাঙ্গা পলাশপাড়ার একরামুলের শ্যালক। এছাড়াও যারা করোনা ভাইরাস আক্রান্তের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন তাদের মধ্যে রয়েছে জেলা শহরের শান্তিপাড়ার মৃত গফুরের ছেলে গোলাম সরোয়ার বেশ কিছুদিন ধরে সর্দি কাশি জ¦রে ভুগছিলেন। বুধবার সকাল ৮টার দিকে তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। হলুদ জোনে ভর্তি করে নমুনা সংগ্রহ করে স্বাস্থ্যবিভাগ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে ৬৭ বছর বয়সী গোলাম সরোয়ার মারা যান। জেলা শহরের বেলগাছির কাদের বকশের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন সর্দি কাশি জ¦রে ভুগছিলেন। তাকেও গত পরশু বুধবার ভোরে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। হলুদ জোনে ভর্তি করে নমুনা নেয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ৫৫ বছর বয়সী ফাতেমা খাতুন মারা যান। তারও মৃতদেহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফনের নির্দেশনা দেন। জেলা সদরের কুতুবপুর গ্রামে মৃত তাপু ম-লের ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক সর্দি কাশি জ¦রে ভুগছিলেন। তাকে গত পরশু বুধবার সকাল ১০টা দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। হলুদ জোনে ভর্তি করা হয়। র‌্যাপিড এন্টিজেন পরীক্ষায় তার নেগেটিভ হলেও চিকিৎসকেরা দেখেন তিনি শাসকষ্টে ভুগছেন। কোভিড-১৯ হলে যেমন হয় তেমনই হচ্ছে আবু বক্কর সিদ্দিকের। নমুনা পরীক্ষার জন্য পিসিআর ল্যাবে প্রেরণও করা হয়। ওই রিপোর্ট আসার আগেই বুধবার দিনগত রাত ২টার দিকে তিনি মারা যান ৬৫ বছর বয়সী আবু বক্কর সিদ্দিক।

চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার নতুন ২৫৯ জনের নুমনা নেওয়া হয়েছে। পূর্বে প্রেরিত একই দিন একই সংখ্যক নমুনা ফলাফল পাওয়া যায়। এতে ৯৪ জনের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৪২ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলার ৯ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ৪ জন ও জীবননগর উপজেলার ৩৯ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪শ ৯৯ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার ২০ জন সুস্থ হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় মোট সুস্থ হলেন ২ হাজার ৩শ ১ জন। বর্তমানে সক্রিয় রোগী রয়েছে ১ হাজার ৮৯ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে রয়েছেন ৭২ জন। বাড়ি রয়েছেন ১ হাজার ১৭ জন। এছাড়াও উপসর্গ নিয়ে সদর হাসপাতালে অর্ধশতাধীক হলুদ জোনে ভর্তি রয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের রেডজোনে থাকা তিন জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদেরকে রেফার্ড করা হয়েছে। এদের একজনকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। দুজনকে নেয়া হয়েছে ঢাকায়।

চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা: এম মারুফ হাসান বলেছেন, গত এক সপ্তাহে চুয়াডাঙ্গায় করোনা পরীক্ষার জন্য সংগ্রহীত নমুনা হিসেবে ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ করোনা ভাইরাস জনিত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের ৭৯ জন অসুস্থ হয়েছেন। এর মধ্যে ৭১ জন ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়েছেন।

 

এদিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেছেন, চুয়াডাঙ্গা জেলায় করোনা পরীক্ষার হার বাড়াতে হবে। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের তরফে নমুনা পরীক্ষার ব্যায়ভার বহন করা হবে। অপরদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। পুলিশ ও বিজিবির পাশাপাশি সেনা সদস্যরাও মাঠে নেমেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ লকডাউনের প্রথম দিনে চুয়াডাঙ্গায় লোক সমাগম ছিলো না বলইে চলে। তবে সকাল থেকেই বৃষ্টি ছিলো। ভ্রাম্যমাণ আদালতও ছিলো রাস্তায়। অপরদিকে দীর্ঘ প্রায় পক্ষকাল ধরেই ভারত সীমান্তবর্তী দামুড়হুদা উপজেলায় কঠোর লকডাউন চলে। প্রশাসনও ছিলো সক্রিয়। এরই সুফল হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সদর ও অন্যান্য উপজেলার তুলনায় দামুড়হুদা উপজেলায় সংক্রমণের হার হ্রাস পেয়েছে। যদিও অনেকেই সর্দি কাশি জ¦র ও গায়ে ব্যাথায় ভুগলেও তাদের বেশিরভাগকেই নমুনা দিয়ে পরীক্ষা করাতে দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই উপসর্গে ভুগলেও পরীক্ষা না করিয়ে নিজেদের মত করে ওষুধ সেবন করছেন। তাতে কাজ না হলে এবং শাসকষ্ট যখন বেড়ে যাচ্ছে তখনই তাদের অনেকেই হাসপাতালমুখি হচ্ছেন। এদের অধিকাংশেরই অবস্থা এতোটাই খারাপ থাকছে যে, চিকিৎসা দিয়েও সুস্থ করা দূরহ হয়ে পড়ছে। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এরকমই তথ্য দিয়ে বলেছেন, করোনা ভাইরাস চুয়াডাঙ্গায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সকলে সুস্থ থাকতে দরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। নূন্যতম জর হলেই নমুনা পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা। অনেকেই জ¦রে ভুগলেও অজ্ঞাত কারণে পরীক্ষা করাচ্ছেন না। এতে বিপদ আরও বাড়ছে।

 

অপরদিকে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামরুজ্জামান চাঁদ বলেছেন, আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছি মানুষকে সচেতন করা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য আমরা মাস্ক দিচ্ছি, মাইকিং করে সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখারও আহ্বান জানানো হচ্ছে। অবাক হলেও সত্য যে, যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের বাড়িতে আমাদের সেনেটারি ইন্সপেক্টর স্টিকার লাগিয়ে এলেও নানাভাবে অনেকেই তা তুলে ফেলছেন। ওইসব বাড়ির অনেকেই নির্বিঘেœ প্রকাশে ঘুরছেন, জনসমাবেশে মিশছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আমরা করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করবো কীভাবে?

গতকাল বৃহস্পতিবার যারা শনাক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে সদর উপজেলার জেলা শহরের শেখপাড়ার ৩ জন, বুজরুকগড়গাড়ির ২ জন, শান্তিপাড়ার ৩ জন, পোস্ট অফিসপাড়ার ২ জন, পলাশপাড়ার ২ জন, ফার্মপাড়ার ২ জন, শহরতলী দৌলাতদিয়াড়ের ২ জন, হাজরাহাটীর একজন। ১ জন করে রোগী শনাক্ত হয়েছেন যেসব এলাকায় তার মধ্যে রয়েছে শহরের জি¦নতলাপাড়া, কেদারগঞ্জপাড়া, সিনেমাহলপাড়া, পানি উন্নয়ন বোর্ড কোয়াটার, থানা কাউন্সিলপাড়া, ফেরীঘাট রোর্ড, বেলগাছি, নূরনগর, সুমিরদিয়া, বড়বাজারপাড়া, দক্ষিণ হাসপাতালপাড়া, কোর্টপাড়া, মাস্টারপাড়া। এছাড়াও জেলা সদরের গ্রাম পর্যায়ের যেসব গ্রামে একজন করে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে সুবদিয়া, ধুতুরহাট, সরোজগঞ্জ, বালিয়াকান্দি, নেহালপুর, পীরপুর, আলুকদিয়া, মনিরামপুর, ট্যাঙরামারি, জালশুকা, রামসিন্দুরপুর। দামুড়হুদা উপজেলার দামুড়হুদার দুজন, দলকালক্ষ্মীপুরের ১ জন ও দর্শনার ১ জন। আলমডাঙ্গা উপজেলার মুন্সিগঞ্জের ৩ জন, কালিদাসপুরের একজন, হাটবোয়ালিয়ার ১ জন, কুমারির একজন, বন্ডবিলের একজনসহ এ উপজেলার বাসিন্দা ঝিনাইদহের মলপাড়ার একজন। জীবননগর উপজেলার হরিহরনগরেই ১৮ জন সংক্রমিত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এ উপজেলার আন্দুলবাড়িয়ার ২ জন, গোকুলনগরের ২ জন। এছাড়া একজন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে যেসব গ্রামে তার মধ্যে রয়েছে মেদনীপুর, গঙ্গাদাসপুর, গোয়ালপাড়া, খয়েরহুদা, নতুন তেতুঁলিয়া, দোয়ারপাড়া, সিঙগাড়া, ধোপাখালী, সুবলপুর, যাদবপুর, মৃগমারিসহ জীবননগর উপজেলা শহরের মহানগর ও বাসস্ট্যান্ডপাড়া। এছাড়াও জীবননগর উপজেলার পার্শবর্তী ঝিনাইদহ মহেশপুরের শ্যামকুড় ও পদ্মপুকুরের একজন করে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *