আহসান আলম : অস্থায়ী রাজধানী ক্ষ্যাত চুয়াডাঙ্গার মানুষের ভাগ্য বদলানোর জন্য এ জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো ভারি শিল্প- কারখানা গড়ে ওঠেনি । তাই কৃষিই এখানকার মানুষের একমাত্র ভরসা । আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত, যা আমরা ধান থেকে পাই । বাংলাদেশে তিন মৌসুমে আউশ ,আমন ও বোরো ধানের আবাদ হলেও মোট উৎপাদিত ধানের শতকরা ৬৫ ভাগ আসে বোরো ধান থেকে । আর বাকী ধান যোগান দেয় আমন ও আউশ ।
এ বছর বোরো মৌসুমে ধানের দাম ভালো পাওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় লক্ষমাত্রার চেয়ে ৪ হাজার ৪৮০ হেক্টর বেশি জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে । কয়েক মৌসুমে ধানের দাম না পাওয়ায় কৃষক ছিল দিশেহারা । যার কারণে বোরো মৌসুমে লক্ষমাত্রার চেয়ে ২ হাজার ৩শ’ ৬০ হেক্টর কম জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। গত ২০১৮-২০১৯ মৌসুমে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল ৩৪ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে আর ২০১৯-২০২০ বোরো আবাদ নেমে আসে ৩১ হাজার ৭শ’ ২৫ হেক্টর জমিতে ।
চুয়াডাঙ্গা কৃষিনির্ভর এ জেলার শতকরা ৭০ ভাগ মানুষই কৃষির উপর নির্ভরশীল । একটি ফসলেরর দাম না পেলে অন্য একটি ফসল আবাদ করে থাকেন এই জেলার কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় ৩০ থেকে ৫০ হেক্টরের মধ্যে মৌসুম ভেদে ধান ,ভুট্টা ও সব্জির আবাদ হয়ে থাকে ।গত বছর আমন ধানের আবাদ হয়েছিল ৩৬ হাজার ৪শ’ ৬০ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর আবাদ হয়েছে ৩২ হাজার ৬শ’ ৬০ হেক্টর জমিতে । ভুট্টার আবাদ হয়েছিল ৪৮ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে । আগাম জাতের সব্জির আবাদ হয়েছে তিন হাজার ৬শ’ ৫৪ হেক্টর জমিতে । এছাড়াও প্রায় ৬ হাজার ৩শ’ ৮২ হেক্টর জমিতে আছে মিশ্র ফলের বাগান ।
বিগত বছর আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল ৩১ হাজার ১শ’ ৯৩ হেক্টর জমিতে । আর চলতি মৌসুমে আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ১শ’ ৭৩ হেক্টর জমিতে । অথার্ৎ গত বছরের তুলনায় ৪ হাজার ৯শ’ ৮০ হেক্টর বেশি জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে । এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৫ হাজার ৬শ’ ৮৫ হেক্টর জমিতে ,আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৭ হাজার ৭শ’ ৮৫ হেক্টর জমিতে ,দামুড়হুদা উপজেলায় ১০ হাজার ৫শ’ ৮৪ হেক্টর জমিতে ও জীবননগর উপজেলায় ৯ হাজার ১শ’ ১৯ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে । আউশ ধানের সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় । এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে ব্রি-৪৮ ও খাটো বাবু ধানের ।
সদর উপজেলার কৃষক নাসির আলী জানান, ৮ একর জমিতে খাটো বাবু জাতের ধানের আবাদ করেছেন । আবহাওয়া ভালো থাকার কারণে ক্ষেতও ভাল হয়েছিল।তিনি জানান, সার কীটনাশক,লেবার সব কিছুর দাম বেশি । এক বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করতে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয় । কয়েক বছর ধরে ধানে লোকসান হয়েছে । আমাদের অন্যান্য আবাদও আছে । এ বছর ধানের বাজার ভালো থাকার কারণে বিগত বছরের লোকসান পুশিয়ে নিতে পারবো। তিনি জানান, তার ধান বিঘা প্রতি ২০-২৪ মন হারে হয়েছে ।
একই উপজেলার দিননাথপুর গ্রামের হারিস মিয়া জানান,৫ একর জমিতে ব্রি-৪৮ জাতের ধানের আবাদ করেছি । এ জাতের ধানের চাহিদা বেশি। চালও মোটামোটি ভাল । ১ বিঘা জমিতে ধান করতে চলতি মৌসুমে খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকার টাকা । ধানের বাজার ভাল থাকায় ১ মন ধান বিক্রি হচ্ছে হাজার টাকায় । তিনি চলতি আউশ মৌসুমে ধান বিক্রি করে আড়াই লাখ টাকা লাভ করবেন ।
দামুড়হুদা উপজেলার মদনা গ্রামের কৃষক ইসহাক বিশ্বাস ১৫বিঘা জমিতে ব্রি-৪৮ জাতের ধানের আবাদ করেছেন । তিনি জানান, আবহাওয়া অনুকুল থাকায় সেচ কম লেগেছে যার কারেণে ধানের আবাদে খরচ কম লেগেছে । বর্তমানে ধানের বাজার ভাল থাকায় চলতি আউশ মৌসুমে আমরা খুশি ।
জেলার দামুড়হুদা উপজেলা কৃষিকর্মকতার্ কৃষিবিদ সেখ মনিরুজ্জামানের প্রচেষ্টায় ৪৬টি ইটভাটার মধ্যে ১২টি ইটভাটায় ১৫৭ বিঘা জমিতে ব্রি-৪৮ জাতের আউশ ধানের আবাদ হয়েছে । এর মধ্যে সবচেয়ে রাজা ইটভাটায় ৪২ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে ।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকতার্ কৃষিবিদ তালহা জুবাইর মাসরুর জানান,বিগত কয়েকবছর থেকেই আমরা ব্লক ওয়ারি পরিকল্পনা গ্রহণ করে আউশ আবাদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা কৃষকদেরকে আউশ ধান চাষে উদ্বুদ্ধকরছি কারণ আউশ ধান চাষ বৃষ্টি নির্ভর ও ভুগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হয়না বলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কম হয় ।
এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় সরকার আউশ আবাদে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করে যার প্রেক্ষিতে বিনামূল্যে আউশ বীজ বিতরণসহ , প্রশিক্ষণ ,সন্ধ্যাকালীন কৃষিবায়েশস্কোপ শো, মাঠ দিবস ,৫০ ভাগ ভর্তুকি ধান কর্তনযন্ত্র বিতরণ ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকদেরকে সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান করা হয় । চুয়াডাঙ্গাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন শস্য বিন্যাস চালু রয়েছে । যেখানে আউশ ধান অন্যতম জনপ্রিয় চাষ হিসেবে কৃষকের কাছে বিবেচিত হচ্ছে। উদাহরণ স্বরুপ এখানে অধিকাংশ কৃষক মাঠফসল হিসেবে ভূট্টা -আউশ-সবজি অথবা সব্জি-আউশ-সব্জি বা ভূট্টা -–সব্জি-আউশ কিংবা বোরো-আউশ –আগাম সব্জি বিন্যাসে ফসল আবাদ করে থাকেন । ভূট্টা আবাদে দেশের শীর্ষস্থানীয় এলাকা হিসেবেও চুয়াডাঙ্গা ভূট্টা সংশ্লিষ্ট শস্য বিন্যাসে আউশ ধান সবচেয়ে উপযুক্ত ও লাভজনক ফসল । শস্য বিন্যাস ও বৃষ্টি নির্ভরতার জন্য অত্র এলাকায় আউশ রোপন দেরিতে হয় কিন্ত উৎপাদন খরচ কম,স্বল্পজীবন কালের উন্নত জাত ব্যবহারে কৃষকের জন্য আউশ আবাদ লাভজনক হওয়াতে বিগত কয়েক বছরে আউশের আবাদ উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বছর চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি রেকর্ড পরিমাণ ১৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে । ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে যেখানে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় আউশ ধানের আবাদ ছিল ৬ হাজার ৮০০ হেক্টর সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর যা পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সুফি রফিকুজ্জামান বলেন , চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোট আউশ আবাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় উচ্চফলনশীল ব্রি-ধান ৪৮ জাতের ধান (১৬ হাজার৭২৯ েেহেক্ট)। এরপরই রয়েছে উপশী জাতের স্থানীয় ভাষায় খাটোবাবু ধান (১২ হাজার ৭২৪ ) হেক্টর যা উচ্চফলনশীল ও রোগবালাই প্রতিরোধী। তাছাড়া অধিকফলনশীল হাইব্রিড জাতের ধান ৭হাজার ৪৭৩হেক্টর সহ উচ্চফলনশীল আধনিক জাত যেমন ব্রিধান -৮২,ব্রি-ধান ৮৫ উত্যাদি চাষেও কৃষকরা আগ্রহী হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গার ভূমি প্রকৃতি (মাঝারি উচু) এবং আবহাওয়া বৃষ্টি নির্ভর।
আউশ ধান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী । ২০২০-২১ অথবছরে অত্র জেলার চারটি উপজেলায় রেকর্ড আউশের আবাদ হয়েছে যার মধ্যে সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর , এরপর দামুড়হুদা উপজেলায় ১০ হাজার ৫৮৪ হেক্টর ,জীবননগর উপজেলায় ৯ হাজার ১১৯ হেক্টর এবং আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৭ হাজার ৭৮৫ হেক্টর জমিতে আউশধান চাষ হয়েছে । কৃষিতে আউশ মৌসুমে ব্রি-৪৮জাত উদ্ভাবন একটি মেঘা ভেরাইটিজ। এ জাতের ফলন মোটামোটি ভাল । বিঘাতে ফলন ১৯ থেকে ২৪ মন পর্যন্ত উৎপন্ন হয়ে থাকে ।