পশ্চিমাঞ্চল রিপোর্ট: পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। সংক্রমণ বাড়া মানেই পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাওয়া। ধীরে ধীরে বাড়লেও রোগীর সংখ্যা যদি বেশী হয়, ক্ষতিটা সমানই হয়। শনাক্তের সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। চুয়াডাঙ্গাসহ দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। মার্চের শেষের দিক থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঊর্ধ্বগতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। এখন শুধু ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাতেই সংক্রমণ আটকে নেই। রোগটি সারা দেশেই হু হু করে ছড়িয়ে পড়ছে। আসন্ন কোরবানীর ঈদের আগেই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ঈদের পর করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভাইরাসবিদ এবং রোগতত্ত্ববিদরা এটাকে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, বিগত ঢেউয়ের তুলনায় এবারে সংক্রমণ লাফিয়ে বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। সংক্রমণ রেখা সোজা উপরে উঠতে থাকলে আক্রান্তের সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটা ধারণা করাও কঠিন।
গত এপ্রিলের পর থেকেই করোনার ঊর্ধ্বগতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এমন উদ্বেগজনক অবস্থার কথা বলেছেন। সংক্রমণ বাড়ার পেছনে মূল দুই কারণ চিহ্নিত করেছেন তারা। এরমধ্যে প্রথম কারণ পরীক্ষা, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন কম এবং দ্বিতীয় কারণ মাস্ক পরতে মানুষের অনীহা। মৃত্যুর হার কমলেও বিশ^ব্যাপি করোনা ভাইরাসের ছোঁয়াচে ডেল্টা ভেরিয়েন্টের সংক্রমণের অনুপাত বেড়ে চলেছে।
গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেশে একদিনে শনাক্তের হার প্রায় ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরও ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৩ হাজার ৩৯৯ জনে। নতুন শনাক্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৮৩ জন। সরকারী হিসাবে এ পর্যন্ত মোট শনাক্ত ৮ লাখ ৪৪ হাজার ৯৭০ জন। ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯৫৫ জন এবং এখন পর্যন্ত ৭ লাখ ৭৮ হাজার ৪২১ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এতে আরও জানানো হয়, ৫২৮টি পরীক্ষাগারে গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ হাজার ৩৭৩টি নমুনা সংগ্রহ এবং ২০ হাজার ৮৮২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৬২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৩৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯২ দশমিক ১২ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
ষ্টাফ রিপোর্টার জানিয়েছেন: চুয়াডাঙ্গায় বিগত দিনের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে একদিনে শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন করে ৭৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্যবিভাগ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৩৫ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলার ৪ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ৩৫ এবং জীবননগর উপজেলার ২ জন বাসীন্দা। আক্রান্তের হার ৩৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ২ হাজার ৫শ’ ২৩ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছে ৭৭ জন।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মারুফ হাসান জানান, গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে কোন নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি। গতকাল ফলাফল এসেছে ১৯৩ জনের। তার মধ্যে ৭৬ জনের করোনা পজেটিভ। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৩৫ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলার ৪ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ৩৫ জন এবং জীবননগর উপজেলার ২ জন বাসীন্দা। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ২ হাজার ৫শ’ ২৩ জন। আক্রান্তের হার ৩৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে ৭৭ জন। গতকাল ৭ জনসহ এ পর্যন্ত মোট সুস্থ্য হয়েছে ১ হাজার ৯শ’ ৩৮ জন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে মোট আক্রান্ত আছে ৫০৮ জন। যার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে আছে ৪৪ জন ও হোম আইসোলেশনে আছে ৪৬০ জন এবং রেফার আছে ৪ জন।
মেহেরপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন: মেহেরপুরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ওই ব্যক্তি গাংনী উপজেলার হুগোলবাড়িয়া গ্রামের বাসীন্দা বিচার আলী (৭০)।
এদিকে, মেহেরেপুরে বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল শুক্রবার ২৪ ঘন্টায় নতুন করে আরও ১৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় বর্তমানে মোট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৪৮ জনে।
গতকাল শুক্রবার রাতে সভিলি র্সাজন ডা. নাসরি উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করছেনে। সিভিল সার্জন জানান, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ল্যাব থেকে আরও ৭০ জনের রিপোর্ট আসে এর মধ্যে ১৪ জনের পজিটিভ রিপোর্ট।
জানা গেছে, মৃত বিচার আলী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ক’একদিন আগে মেহেরপুর জেনারেল হাসপালে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। গতকাল শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্তায় তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা: মকলেছুর রহমান পলাশ।
তিনি জানান, বিচার আলী করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত বিচার আলীকে হুগোলবাড়িয়া কবরস্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন সম্পন্ন করার জন্য সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এ নিয়ে জেলায় বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা ২৪৮ জন। এদের মধ্যে সদর উপজেলার ৭০ জন, গাংনী উপজেলার ১০৬ জন ও মুজিবনগর উপজেলার ৭২ জন রয়েছে। জেলায় সুস্থ্য হয়ে বাড়ী ফিরেছেন ৯৭৭ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৩১ জন। সবাইকে সামাজিক দূরত্ব মেনে, নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোবার অভ্যাস বজায় রাখাসহ মাস্ক ব্যবহার, জন সমাগম এড়িয়ে চলা এবং হাঁিচ-কাশির শিষ্ঠাচার মেনে চলার আহবান জানিয়েছেন সভিলি র্সাজন ডাঃ নাসির উদ্দিন।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানিয়েছেন: ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে বর্তমানে করোনা আক্রান্ত রুগীদের চিকিৎসা দিতে হিমসিম খাচ্ছেন ডাক্তার ও সেবীকারা। পর্যাপ্ত সিট না থাকায় হাসপাতালের বারান্দায় রোগীদের বিছানা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজস্ব ফেসবুক লাইভে পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু বলেছেন- আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি সিট সংখ্যা বাড়ানো। বেশ কিছু দিন করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রয়োগ বন্ধ ছিল আজ শনিবার থেকে আবারও সাধারণ মানুষ যারা রেজিষ্ট্রেশন করেছেন তাদেরকে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে।
উল্লেখ্য- অনেক করোনা আক্রান্ত রোগী কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শে নিজ বাড়ীতে আইসোলেশনে আছেন। ভারত থেকে অবৈধ ভাবে অনুপ্রবেশের কারনে জনসাধারণের মাঝে করোনার বিস্তার ঘটছে বলেও অনেক বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। আজ শনিবার থেকে ঝিনাইদহে এক সপ্তাহের লকডাউন শুরু হচ্ছে। দোকান শপিংমল সকাল ৬টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। প্রশাসন নিয়মিতভাবে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সচেতনতানামুলক প্রচার করছেন। নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটবৃন্দ নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। মাস্ক বিহীন মানুষের চলাচলে নিয়মিত জরিমানা করছেন।
গতকাল শুক্রবার ঝিনাইদহে ১৫২টি নমুনার মধ্যে আক্রান্ত ৫৪ জন। সদরে ১৮, শৈলকুপায় ৯, হরিণাকুণ্ডে ৭, কালীগঞ্জে ৭, কোটচাদপুরে ৩, মহেশপুরে ১০ জন। আক্রান্তের হার ৩৫.৫২%।
হরিণাকুণ্ডু প্রতিনিধি জানিয়েছেন: ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডুতে করোনা আক্রান্ত হয়ে জাহানারা বেগম (৭০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সে উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত হবিবার রহমান বিশ্বাসের স্ত্রী।
ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের উপ-পরিচালক আব্দুল হামিদ খান জানান, জাহানারা বেগম করোনা উপসর্গে অসুস্থ হওয়ার পর হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। গতকাল বৃহস্পতিবার তার করোনা রিপোর্ট পজেটিভ আসে। পরে, চিকিৎসক তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে রেফার্ড করলেও তিনি নিজ বাড়ীতে চলে আসেন। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাতে তার মৃত্যু হয়। ইসলামিক ফাউণ্ডেশন গঠিত (ইফা) কমিটি তার জানাযা শেষে নিজ গ্রামের গোরস্থানে দাফন করে। এ নিয়ে মোট ৮০জন করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন করলো ইফা গঠিত কমিটি।