দীর্ঘ ১৫ বছর পর প্রবাসী স্বামী বাড়ি ফেরার দুইদিন আগে স্ত্রী খুন : ৩ জনকে থানায় নিয়ে চলছে জিজ্ঞাসাবাদ

চুয়াডাঙ্গার যাদবপুরে নিজ ঘরে প্রবাসী স্ত্রীর গলাকাটা লাস উদ্ধারঃনেপথ্যে পরকীয়া

সরোজগঞ্জ প্রতিনিধি: চুয়াডাঙ্গার নতুন যাদবপুরে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে গলা কেটে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। নিজ বিছানায় মঙ্গলবার গভীর রাতে তাকে খুন করা হয়। সদর উপজেলার নতুন যাদবপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জেসমিন আরা আয়না ওই গ্রামের কুয়েত প্রবাসী হাবিবুর রহমান হাবিলের স্ত্রী। পরকীয়া প্রেমের কারণে তিনি খুন হয়ে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে এলাকাবাসীর ধারণা। এ ঘটনায় গ্রামের ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন একই গ্রামের মৃত সৌরভ হোসেনের ছেলে হাসান আলী, মৃত বাহার নস্করের ছেলে রহমান ও উসমান মন্ডলের ছেলে মামুন। পরে আরও ৩জন আটক করা হয়েছে।


পুলিশ ও এলাকাসূত্রে জানা গেছে, জেসমিন আরা আয়না (৩৮) মঙ্গলবার রাতে নিজ ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে তার গোঙানির শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা জেসমিনের বাড়িতে আসে। এ সময় দেখা যায় খাটের ওপর জেসমিনের রক্তাক্ত মৃত দেহ। তবে ঘরের গ্রিলের তালা খোলা ছিলো। এ কারণেই পুলিশের ধারণা জেসমিনের সম্মতিতেই খুনি ঘরে ঢুকে খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছে, হাবিবুর রহমান হাবিল প্রায় ১৫ বছর ধরে কুয়েতে রয়েছেন। দুই সন্তান নিয়ে স্ত্রী জেসমিন আরা স্বামীর বাড়িতেই থাকতেন। বড় মেয়ে তাসমিমকে সম্প্রতি বিয়ে দেন। ঘটনার দিন মেয়ে তাসমিম শ্বশুরবাড়িতে ছিলো। ছেলে আজমির হোসেন ছিল ফুফুর বাড়িতে। জেসমিন আরা আয়না মঙ্গলবার রাতে একাই ঘরে ছিলেন। তিনি পরকীয়ায় আসক্ত ছিলেন বলেও গ্রামের অনেকেই মন্তব্য করেন। গ্রামের কেউ কেউ জানান, জেসমিন আরার স্বামী হাবিল আগামী ১০ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরবেন। তার আসার মাত্র দু’দিন আগে স্ত্রী খুন হলেন।
গ্রামের একটি সূত্র জানায়, জেসমিন আরার কাছ থেকে গ্রামের একজন ১০ লাখ টাকা ধার নিয়েছে। স্বামী বাড়ি ফেরার আগেই ওই টাকা উদ্ধারের জন্য জেসমিন আরা টাকা গ্রহীতাকে চাপ দিচ্ছিলেন। এ কারণেও তিনি খুন হয়েছেন কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। নিহত জেসমিনের বোন সাথী খাতুন বলেন, ‘আমার বোন জেসমিন শাশুড়ির সঙ্গেই থাকতো। সপ্তাহ খানেক আগে তার শাশুড়ি মারা যান। এরপর থেকে একাই বাড়িতে থাকতো।’ জেসমিনের মেয়ে সদ্যবিবাহিত তাসমিন বলেন, আমার মাকে কয়েকদিন ধরে মোবাইলফোনে কেউ বিরক্ত করছিলো শুনেছি। আগের দিন সিমও পরিবর্তন করেন মা।’
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি আবু জিহাদ খান জানান, ‘খুনের ধরণ দেখে মনে হয়েছে অপেশাদার খুনি। ঘটনাস্থল থেকে একটি ধারালো ছুরি ও কয়েকটি কাঁচের গ্লাস উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে আমরা খুনের নেপথ্য জানার চেষ্টা করছি। আশাকরি খুব শিগগিরই খুনি শনাক্ত হবে। থানায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।’
পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক নিখিল চন্দ্র অধিকারী বলেন, রাত দুইটায় তারা স্থানীয় কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমেদ হাসানুজ্জামানের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি একদল পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। বাড়িটির মূল ফটক ও ঘরের কলাপসিবল গেট বন্ধ ছিলো। ওই গৃহবধূর বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তারা। তার গলায় তখনো ছুরি বিদ্ধ অবস্থায় ছিলো। খবর পেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয় পুলিশ। তারা লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় গলার নিচে ও বাঁপাশে এবং বাঁহাত ও ঘাড়ের একাধিক স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পেয়েছে। সারা শরীরে রয়েছে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। এলোপাতাড়ি কোপানো হয়েছে তাকে।
নিহত জেসমিনের বাবার বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার কেসমত ঘোড়াগাছা গ্রামে। খবর পেয়ে সেখান থেকে স্বজনেরা ছুটে আসেন। জেসমিনের ভাই আবদুর রউফ বলেন, তার ভগ্নিপতি হাবিবুর রহমান দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকেন। এ সুযোগে প্রতিবেশী এক ব্যক্তি জেসমিনকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করতেন বলে তারা জানতে পেরেছেন।
স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে ২০ বছর আগে ঝিনাইদহ হরিণাকুন্ডু উপজেলার কেসমত গোড়াগাছা আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে জেসমিন খাতুন ওরফে আয়না খাতুনের সাথে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের সরোজগঞ্জ নতুন যাদবপুর গ্রামের হাতেম মন্ডলের ছেলে হাবিবুর রহমান হাবিলের বিয়ে হয়। বিয়ের ২ বছর পর হাবিবুর রহমান হাবিল জীবিকার তাগিতে কুয়েতে যান। তাদের রয়েছে একটি মেয়ে তাসমিন (১৮) সদ্য বিবাহিত। ছেলে আজমিরের বয়স আট বছর। ঘটনার সময় ৮ বছরের ছেলে আজমির ছিলো তার ফুফুর বাড়িতে।
হাবিবুর রহমান হাবিলের বোন রাশিদা জানান, গত মঙ্গলবার রাতে আব্দুর রহমানের ছেলে রাব্বি আমাকে সহ আমার পরিবারের সদস্যদের সরবত খাওয়াই। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। রাতে ভাবীর গোঙানির শব্দ শুনে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি। পরে ভেতরে ঢুকতে না পেরে মই দিয়ে এক ছাদ থেকে অন্যের ছাদে উঠে ওই ঘরে ঢুকে দেখি খাটের ওপর ভাবীর গলাকাটা লাশ দেখ পাই।
গোপনসূত্রে জানা গেছে, ৫ বছর আগে জেসমিন খাতুন ওরফে আয়না খাতুন হাবিবুর রহমান হাবিল প্রবাসে থাকাকালীন একই গ্রামের ওসমান আলীর ছেলে মামুনের হাত ধরে চলে যায়। পরে উভয়ের আপস মীমাংসার পর হাবিবুর রহমান হাবিল তার স্ত্রীকে নিজ জিম্মায় নিয়ে নেয়। পরে হাবিবুর রহমান হাবিল তার স্ত্রীকে রেখে আবারও কুয়েতে চলে যান। চলতি মাসের ১০ তারিখে হাবিলের দেশে ফেরার কথা। তার মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে জেসমিন খাতুন ওরফে আয়না খাতুনকে কে বা কারা হত্যা করে। অনেকেই মন্তব্য করে বলেছে হাবিলের আসার কথা জানতে পারার পরই তার স্ত্রী জেসমিন খাতুন ওরফে আয়না খাতুনের নিকট থেকে যে সকল অর্থ নিয়ে নিয়েছে তা চাওয়া নিয়ে এমন কান্ড ঘটাতে পারে।