৪৫ বছর বয়সী আশরাফ আলী বংশপরম্পরায় তাঁতি। বাপ-দাদার পেশা শ্রদ্ধার সঙ্গে আগলে রেখেছেন দিনের পর দিন। হস্তচালিত তাঁতযন্ত্রে কাপড় বুনে ও বিক্রি করে মোটা ভাত, মোটা কাপড়ের অভাব ছিল না সংসারে। করোনায় চরম দুরবস্থায় পড়েছেন আশরাফ। জাত পেশায় এখন ভাত জোটলেও তরকারি জুটছে না। পরনের নতুন কাপড় পাওয়া এখন স্বপ্নের মতো।

শুধু আশরাফ একা নন, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার এরশাদপুরের তাঁতের সঙ্গে জড়িত প্রায় প্রত্যেকেরই এ দূরবস্থা। কয়েক তাঁতি বলেন, একসময় গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকলেও জীবিকার প্রয়োজনে অনেকেই পেশা বদল করেছেন। তাঁরা এখন হোটেলের কর্মচারী, রিকশা-ভ্যানচালক, রাজমিস্ত্রির সহকারী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাঁতপল্লী এরশাদপুরের ঐতিহ্য বিলীনের পথে। এখানকার বাসিন্দাদের দাবি, কয়েক বছর ধরে তাঁতপণ্যের বাজার পড়তির দিকে ছিল। কিন্তু করোনা সব তছনছ করে দিয়েছে।

গত রোববার এরশাদপুরে গিয়ে দেখা যায়, একসময়ের প্রধান ও একমাত্র অবলম্বন হস্তচালিত তাঁতযন্ত্র অবহেলায় পড়ে আছে। তবে খানিক পরপর কয়েকটা বাড়ি থেকে বাতাসে ভেসে আসছে তাঁতের খট খটা খট শব্দ। সেই শব্দকে অনুসরণ করে কয়েকজন তাঁতি, মহাজন ও স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

আলমডাঙ্গা সরকারী ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আমিরুল ইসলাম জানান, এরশাদপুরের কাপড়ের ঐতিহ্য ছিল পাকারঙ। তাঁতিরা দোকান বা মহাজনের কাছ থেকে সুতা কিনে সরাসরি কাপড় বুনতেন না। সুতা প্রথমে সাবান দিয়ে পরিষ্কার এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে ভিজিয়ে গরম পানিতে সেদ্ধ করার পর তা শুকিয়ে কাপড় বুনতেন।

আমিরুল আরও বলেন, আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের পাশে ছিল তাঁতের তৈরী কাপড়ের বড় মোকাম। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার পোড়াদহ ও পাবনার শাহজাদপুরের হাটেও ছিল আলমডাঙ্গার তাঁতপণ্যের কদর। আধুনিক তাঁতযন্ত্রে (পাওয়ারলুম) বোনা কাপড় ও ছাপা শাড়ির প্রচলন হওয়ার পর থেকে এখানকার পণ্যের চাহিদা কমতে থাকে।

তাঁতি আশরাফ জানান, আগে তিনি লুঙ্গি, গামছা ও তোয়ালে তৈরি করতেন। বর্তমানে শুধু তোয়ালে তৈরি করছেন। ৪টি তোয়ালে তৈরি করলে খরচ বাদে থাকে মাত্র ৬০ টাকা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছয়টির বেশি তোয়ালে তৈরি করা যায় না। সারা দিন পরিশ্রম করেও ১০০ টাকা উপার্জন হয় না।
আশরাফ সরাসরিই বলেন, ‘অভাবের সংসারে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বউ বাবার বাড়িতে গিয়ে আর ফেরেননি। সামান্য উপার্জন দিয়েই বৃদ্ধা মা ও বিবাহযোগ্য বোনকে নিয়ে তিন সদস্যের পরিবার চালাতে হচ্ছে। টাকার অভাবে মায়ের চোখের অস্ত্রোপচার করতে পারছি না।’
গৃহবধূ সীমা খাতুন বলেন, স্বামী রাজীব আহাম্মেদ আগে তাঁত বুনতেন। করোনা শুরুর পর থেকে রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ বেছে নেন। তবে সীমা জাত পেশাকে ধরে রেখেছেন। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জন দিয়ে তাঁদের দুই সন্তানসহ চার সদস্যের পরিবার চলে যাচ্ছে।

তাঁতিরা জানান, একসময় সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ছিল ৫০ টাকা, সেই সময়ে তাঁত পেশার শ্রমিকেরা আয় করতেন ১৫০ টাকা। সাধারণ শ্রমিকের মজুরি বর্তমানে ৩০০/৪০০ টাকা হলেও তাঁতিদের আয় বাড়েনি। করোনায় আরও কমেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহাজন শাহাবুল হোসেন ও মহিউদ্দিন বাগু নানাভাবে সহযোগিতা করে এলাকার তাঁত পেশাকে কোনো রকম টিকিয়ে রেখেছেন। মহিউদ্দিন বলেন, ‘আগে খরচ বাদে মাসে ২৫ হাজারের বেশী আয় করতাম। সুতার দাম বেড়ে যাওয়া, বাজারে তাঁতপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় বর্তমানে তা নেমে ছয় হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।’

আলমডাঙ্গা কেন্দ্রীয় তন্তু সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য আবু মুসার অভিযোগ, অন্য সব পেশার মানুষ করোনাকালীন বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহযোগিতা পেলেও এখানকার তাঁতিরা তা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। তাঁরা খেয়ে না খেয়ে সময় পার করলেও কেউ খোঁজ নেননি।

জেলা প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম সরকার জানান, তাঁতিদের এ সমস্যার কথা কেউ জানাননি। তিনি বলেন, আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।