গাংনী অফিসঃ মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার দুটি গ্রাম গাড়াডোব ও জোড়পুকুরিয়া গ্রাম। গ্রামে ঢুকেই মনে হলো শুনশান নিরবতা। কোন কোন বাড়ী থেকে স্বজন হারানো কান্নার সুর।প্রায় প্রতিদিনই গ্রামের মসজিদের মাইকে প্রচার করা হয়েছে শোক সংবাদের দুঃসংবাদ। মাইকের শব্দ কানে ভেসে এলেই গ্রামবাসী আতকে উঠে। স্বজন হারানোর ভয় তাড়া করে ফেরে। গ্রাম দু’টি সরেজমিনে ঘুরে গ্রাামের কবরস্থানে গিয়ে দেখা মেলে এক সারিতে ২৪ জনের কবর। কাঁচা বাঁশের নতুন রেলিং দিয়ে ঘেরা কবরে চির সমাহিত গ্রামের বিভিন্ন বয়সী মানুষ। গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে,করোনা আক্রান্তে মারা গেছেন গাংনী উপজেলার সাহারবাটী ইউনিয়নের জোড়পুকুরিয়া গ্রামের কোলুপাড়া মকলেছুর রহমান (৪৫)।
এছাড়াও নানা ভাবে অসুস্থ যেমন প্রেসার, স্ট্রোক, এ্যাজমা,ক্যানসার ইত্যাদি রোগে বয়স্ক মানুষ করোনা উপসর্গ এবং নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে চলতি ২ মাসে মারা গেছেন,একই গ্রামের ইকতার আলী (৭৫),নকিম উদ্দীন (৫০),রোজিনা খাতুন (৬৫),তছির উদ্দীন (৮০),আব্দুল খালেক মহুরা (৮০),হালিমা খাতুন (৭৫),জমেলা খাতুন (৭৮),পল্টু আলী (২৭),করিম আলী (৮৫),রাবেয়া খাতুন (৬০),আব্দুল হামিদ (৭৫)।

গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক হাসান আল নূরানী জানান,আমি এই গ্রামের মানুষ।এই গ্রামেই বড় হয়েছি। ১ মাসে এতগুলো মৃত্যুর ঘটনা আমরা কখনো দেখিনি। ভোরের দিকে মসজিদের মাইকে ভেসে আসা মৃত্যুর খবর গ্রামের মানুষের কানে যেনো বেজেই যাচ্ছে। এক জনের মরদেহ দাফন সম্পন্ন করে বাড়ি ফেরার আগেই আরেক জনের মৃত্যুর খবর! গ্রামের ইতিহাসে এতো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম। তাই করোনার ভীতি ছড়িয়েছে সকলের মনে। তবুও করোনা উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ থাকা লোকজন করোনা নমুনা পরীক্ষা করানো নিয়ে অনীহা দেখাচ্ছে । নানা ধরণের গুজব, ভীতি আর অনীহায় করোনা পরীক্ষা থেকে দূরে সরে আছেন গ্রামের মানুষ। এতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানালেন কয়েকজন সচেতন মানুষ। এমনই চিত্র গঁাড়াডোব গ্রামের। উপজেলার ধানখোলা ইউনিয়নের গাড়াডোব গ্রামে চলতি ২ মাসে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। এদের মধ্য করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪জন। এরা হলেন-গঁাড়াডোব গ্রামের লাভলু হোসেনের স্ত্রী মিলি খাতুন (৪৫),মৃত আব্দুর রশীদের ছেলে বাবর আলী(৩৩),মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে আনারুল ইসলাম (৭০),সেন্টু আলীর মেয়ে কবিতা খাতুন (২৫)।

এছাড়াও সর্দি-জ্বর ও বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন একই গ্রামের বছের আলী (৮০),মৃত গোলাম রসুলের ছেলে আব্দুল হালিম (৩২),একই গ্রামের মৌসুমী খাতুন (৩৫), মাছিরন নেছা (৫৫),গোপাল দাশের স্ত্রী মেকলি দাশী (৬৫),আব্দুল মান্নানের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন (৪৫),একই গ্রামের ফজলুল হক (৬২),সুরমান আলী (৬৫),কোরবান আলী (৬৪),কেরামত আলী (৫০) ও তার মা আবেদা খাতুন (৮০),একই গ্রামের রাশেদা খাতুন (৬০) ও মেহেরন নেছা (৭৯)। এই তথ্যকে উল্টোভাবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ভুল তথ্য তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশ করেছে। একে করে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়েছে।

মেহেরপুর জেলার অনেকে গ্রামের চিত্র এমন হলেও করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষের অসচেতনতাকেই দায়ী করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
জানা গেছে, জোড়পুকুরিয়া ও গাড়াডোব গ্রামে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত, বার্ধক্য, দীর্ঘদিনের রোগাক্রান্ত এবং কিছু মানুষের করোনা উপগর্সও ছিল। এছাড়াও বিপুল সংখ্যক মানুষ সর্দি, জ্বর ও করোনার অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে করোনা পরীক্ষার আওতার বাইরে রয়েছে।

তিনি বলেন, জোড়পুকুরিয়া ও আশেপাশের গ্রামের প্রায়ই প্রতিটি বাড়ির মানুষেরই করোনা উপসর্গ আছে। গত শনিবার স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল গ্রামের ২৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে মাত্র ৫ জনের করোনা পজিটিভ রয়েছে বলে জানিয়েছেন।
জোড়পুকুরিয়া গ্রাম সূত্রে জানা গেছে, গেল এক মাসে যে ২৪ জন মৃত্যু বরণ করেছেন এদের মধে একজন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকিদের কেউ করোনা পরীক্ষা করেননি। এতো কিছুর পরেও গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানা ও করোনা পরীক্ষার বিষয়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে বিরত থাকছেন।

এদিকে জোড়পুকুরিয়া গ্রামের মতোই একই চিত্র গাড়াডোব গ্রামের। গাড়াডোব গ্রামে মৃত্যু বরণকারী ২১ জনের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ছিলেন ৪ জন। বাকি যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের কারও পরীক্ষা হয়নি।

গাড়াডোব গ্রামের করোনা আক্রান্তে মারা যাওয়া বাবর আলীর চাচাতো ভাই আব্দুল মোমিন জানান, করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও করোনা পরীক্ষা নিয়ে নানা ধরণের গুজবে ডুবে আছে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ। ফলে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ আক্রান্ত হলেও পরীক্ষা করানো যাচ্ছে না। সর্দি, জ্বর করোনার অন্যান্য উপসর্গ থাকা কেউ যখন অক্সিজেন সংকটে পড়ছেন তখন তাকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে যারা বিভিন্ন রোগে ভূগছেন। তাদেরকেই কেবল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিতেই অভ্যস্থ।
স্থানীয় ধানখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখেরুজ্জামান জানান গাড়াডোবসহ ধানখোলা ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে প্রায়ই মানুষ মারা যাচ্ছে। মারা যাওয়া এসব মানুষ অধিকাংশই করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে। সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেকটি মানুষকে করোনা পরীক্ষা (টেস্ট) করার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। তারপরও করোনা পরীক্ষা করতে মানুষ অনীহা প্রকাশ করছে।

করোনা পরীক্ষা ও আক্রান্ত হলে কোন ভীতি নেই উল্লেখ করে মেহেরপুর সিভিল সার্জন ডাঃ নাসির উদ্দীন বলেন, মেহেরপুরের প্রতিদিনের করোনা আপডেট আমরা সবাই জানি। জেলায় এপর্যন্ত করোনায় ভাইরাসে মারা গেছে ১৩৭ জন । তন্মধ্যে গাংনী উপজেলায় রয়েছে ৪৬ জন । অথচ দুই গ্রামে মারা গেছে ৪৪ জন ্তথ্যটি ঠিক নয়। ঠাণ্ডা কাশি যাদের হচ্ছে তারা যদি সচেতন হয় তাহলে অনেক নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাদেরকে হাসপাতালে আসতে হবে প্রয়োজনে টেস্ট করাতে হবে। তাছাড়া অনেকে তথ্য গোপন করছে বিধায় অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
এদিকে গাড়াডোব গ্রামে কবর খোঁড়ার দায়িত্বপালনকারী আহাদুল ইসলাম জানান,প্রতিদিন মৃত্যু হওয়ায় কবর রাত পোহালেই আমরা কয়েকজন কবর খুঁড়তে দৌড়ায়। এজন্য আমাদের ভিতর যেনো ভীতি কাজ করছে। এবং কবর খুঁড়তে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এব্যাপারে গাংনী উপজেলা নিবার্হী অফিসার মৌসুমী খানম জানান, করোনা রোগে দুই গ্রামে ৪৪ জন মানুষ মারা যাওয়ার খবরটি সঠিক নয়। এটা আমাদের জেলার ভাবমূর্তি ও মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর মান ক্ষুন্ন করতে কে বা কারা জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমে তুলে ধরেছে। আমি এর নিন্দা জানাচ্ছি।