নামমাত্র নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ॥ নিয়মবহির্ভূত পরীক্ষা গ্রহণের চেষ্টা
জেলা প্রশাসক বললেন, তদন্ত করে নেয়া হবে ব্যবস্থা ॥ প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে কিছুই জানেন না উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা

ষ্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অর্থের বিনিময়ে সাজানো পরীক্ষা দেখিয়ে চারটি পদে লোক নিয়োগের পায়তারার খবরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। রোববার (২৬ জুন) বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর প্রশাসনিক ও শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম খান বলেন, কলাবাড়ী রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চারটি পদে নিয়োগ নিয়ে একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর নজরে এসেছে। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এজন্য দামুড়হুদা ইউএনওকে বলা হয়েছে। কলাবাড়ী রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চারজন কর্মচারী নিয়োগের বিষয়টি গোপনে প্রায়ই চুড়ান্ত করা হলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রোববার পর্যন্ত তা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেন নি।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আতাউর রহমান জানান, রোববার দুপুরে একজন সিনিয়র সাংবাদিকের কাছ থেকে তিনি বিষয়টি জেনেছেন। এসময় তিনি বলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা ও আইসিটি) সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল মতিন জানান, আমি এ বিষয়টি কিছুই জানি না। আমি আপনার কাছেই শুনলাম, তবে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হবে সেটা জানতাম। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কমিটি সীদ্ধান্ত নিবেন, যেহেতু এটা একক কোন বিষয় না। তবে এ প্রতিবেদক যখন উপজেলা শিক্ষা অফিসার এর কার্যালয়ে যান তখন উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। নিয়োগের অর্থ বাণিজ্যের বিষয়টি আপনি কেমনভাবে দেখছেন প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, এটার সত্য অসত্য’র বিষয় থাকে। এটা তদন্ত সাপেক্ষ বলা যাবে, তবে পরীক্ষার ডেট পড়ে গেছে।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে রোববার (২৬ জুন) দৈনিক পশ্চিমাঞ্চলসহ স্থানীয় পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় কলাবাড়ী রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪টি পদে নিয়োগ পরীক্ষা মঙ্গলবার, ৪১ লাখ টাকায় ৪ প্রার্থী আগেই চুড়ান্ত শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর কলাবাড়ী-রামনগর এলাকাসহ জেলা জুড়ে তোলপাড় হয়। নিয়োগ কেলেঙ্কারীর সঙ্গে জড়িতরা অনুসন্ধানে নামেন, কীভাবে সাংবাদিকরা এমন তথ্য পেল। তাঁদেরকে কে বা কারা পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিল তা খুঁজে বের করতে গতকাল রোববার দিনভর মাঠে নামে।

২৬ জুনের প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে,  মঙ্গলবার (২৯ জুন) কলাবাড়ী রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চারটি পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নিয়োগ পরীক্ষার আগেই কর্তৃপক্ষ অর্থের বিনিময়ে চারজন প্রার্থীকে চুড়ান্ত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সোহরাব হোসেন ও বিদ্যুৎসাহী সদস্য রাশেদীন আমিন রাজন যোগসাজশ করে চারজন প্রার্থীর সঙ্গে ৪১ লাখ টাকায় সমঝোতা করেছে। টাকা লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ পেতে যাওয়া চারজনের নাম এলাকার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ভুক্তভোগীরা যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মচারী নিয়োগের দাবি তুলেছে।

যে চারটি পদে চারজনকে নিয়োগ দেয়ার পায়তারা চলছে তাঁরা হলেন, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে দামুড়হুদা উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে আব্দুর রাব্বি, আয়া পদে রামনগর গ্রামের ছাগবার আলীর মেয়ে জুলেখা খাতুন, নিরাপত্তাকর্মী পদে গোপালপুর গ্রামের ফরজ আলীর ছেলে রিপন আলী ও অফিস সহায়ক পদে রামনগর গ্রামের জিয়াউর রহমানের ছেলে ইয়াছিন আলী। তবে, চারটি শুন্য পদের জন্য স্ব-স্ব ইউনিয়নের মোট ৪০টিও বেশী আবেদন জমা পড়ে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান তাঁর দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী উল্লিখিত চারটি পদে নিয়োগের জন্য প্রায় ছয়মাস আগে ছক আঁকে। ছক অনুযায়ী পছন্দের লোকদেরকে দিয়ে অনেকটা কৌশলে সোহরাব হোসেনকে সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকের শ্যালক চুয়াডাঙ্গা ফাযিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক(কৃষি) রাশদীন আমিন রাজনকে বিদ্যুৎসাহী সদস্য করে গত পাঁচমাস আগে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি(এসএমসি ) গঠন করে। এসএমসি গঠনের কিছুদিন পর অনেকটা তাড়াহুড়ো করে চারটি পদে নিয়োগের জন্য স্থানীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর চারটি পদের বিপরীতে অন্তত ৪০টি দরখাস্ত জমা পড়ে। যার মধ্যে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নয়টি, আয়া পদে ১২টি, নিরাপত্তাকর্মী পদে ছয়টি ও অফিস সহায়ক পদে ১৩টি দরখাস্ত জমা পড়ে। দরখাস্ত জমাপড়ার পর প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান সভাপতি সোহরাব হোসেনকে সাথে নিয়ে প্রার্থীদের সঙ্গে দরকষাকষি শুরু করেন। একপর্যায়ে চারটি পদের বিপরীতের চারজন প্রার্থীকে অর্থের বিনিময়ে চুড়ান্ত করেন। এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে এসব নিয়োগের জন্য আব্দুর রাব্বির সঙ্গে ১২ লাখ, জুলেখা খাতুনের সঙ্গে ৮ লাখ, রিপন আলীর সঙ্গে ৯ লাখ ও ইয়াছিন আলীর সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার নিয়োগ পরীক্ষার সাজানো নাটক করে এই চারজনকে নিয়োগ দেয়া হবে।

নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদনকারীদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, অফিস সহায়ক পদে আমি আবেদন করেছি। টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হোক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন এ প্রতিবেদক কে বলেন, যদি নিযোগ বিজ্ঞপ্তির আগেই পছন্দের প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তাহলে কেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলেন? এখানে চার পদের প্রার্থীদের কাছ থেকে ব্যাংক ড্রাফট নেওয়া হয়েছে, এটাও তো এক ধরণের প্রতারণা। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেছেন।

এ ব্যপারে প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি একেবারেই সত্য না। তাছাড়া নিয়োগ চুড়ান্ত করবে কমিটি। আমি একা নিয়োগ দেয়ার মালিক না।

সভাপতি সোহরাব হোসেন অর্থবাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করেন।

 

পশ্চিমাঞ্চল/পল্টন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *