আজ দামুড়হুদার জয়রামপুরে মমার্ন্তিক সড়ক দুর্ঘটনার ৪র্থ বার্ষিকী
হতভাগ্য পরিবারগুলো নিদারুণ কষ্টে থাকলেও কেউ খোঁজ রাখেনি

★২ জনের বিধবা ভাতা জুটলেও জোটেনি বাকি ৭ জনের,

★অর্থাভাবে জোগানো যাচ্ছে না লেখা পড়ার খরচ,

★টাকার অভাবে ১২৩ টি সেলাইযুক্ত গুরুতর আহত আর এক শ্রমিকের করানো যাচ্ছে না চিকিৎসা


জাহিদুল ইসলাম এফ এ আলমগীর চঞ্চল মেহমুদ দর্শনা অফিস থেকেঃ আজ ২৬ মার্চ, এদেশের সংগ্রামী মানুষের চেতনাদীপ্ত মহান স্বাধীনতা দিবস। আজ থেকে ৪ বছর আগে আজকের দিনে পরিবার পরিজনের জন্য দুমুঠো আহারের অন্বেষনে বের হয়ে জেলার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কের জয়রামপুর বটতলা নামক স্থানে ট্রাক ও আলমসাধুর মুখোমুখি সংঘর্ষে হতদরিদ্র ১৩ জন শ্রমিক নিহত ও ৯ জন গুরুতর আহত হয়েছিল। সকাল সাড়ে ৬টার এ দূর্ঘটনা মুহুর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জেলাবাসীর স্বাধীনতার উৎসব যেন নিমিষেই বিষাদে পরিনত হয়।নিহত শ্রমিকরা হলেন দামুড়হুদা উপজেলার মদনা-পারকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বড়বলদিয়া গ্রামের খোদা বক্সের ছেলে আলমসাধু চালক জজ মিয়া (৩২), একই গ্রামের গাজিউর রহমানের ছেলে শান্ত (২০), রমজান আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম (৫০), বাবুল হোসেনের ছেলে হাফিজুল ইসলাম (২৭), ইন্নালের ছেলে আকুব্বর (৫৫), ফকির মন্ডলের ছেলে লালচাদ (৪৮), কিতাব আলীর ছেলে নজির আহমেদ (৫২), গোলাম রহমানের ছেলে ইজ্জত আলী (৪৭), ভোলাই মন্ডলের ছেলে বিল্লাল (৪৫), রহিম বক্সে ছেলে আবদার আলী (৪৩), ঠান্ডু মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন (৩৫), লিয়াকত আলীর ছেলে শাহিন আলী (২৪) ও একই উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের মৃত ফিরোজ মন্ডলের ছেলে শফিকুল ইসলাম (২৫)। হতভাগ্যরা উপজেলার বড় বলদিয়া গ্রাম থেকে ২২ জন মাটি কাটা শ্রমিক আলমসাধুতে করে কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গায় যাওয়ার পথে জয়রামপুর বটতলায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বালিবাহী ট্রাকের (চুয়াডাঙ্গা ট-১১-০৫৮৮) সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। ট্রাক চালক ঘুমিয়ে পড়ার কারনে এতগুলো প্রাণ নিমিষেই নিভে যায়। ঘটনার পর অনেক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও সংস্থা তাদের দিকে সহযোগীতার হাত বাড়ালেও বর্তমানে কেউ তেমন খোঁজ রাখেনা। মাত্র ২০ হাজার টাকা প্রানের মূল্য দিয়ে মালিক পক্ষ ছাড়া পেলেও উপার্জনকারী ও অভিভাবকহারা হতভাগ্য পরিবার গুলো কেমন আছে তা জানতে আমরা গিয়েছিলাম বড়বলদিয়া গ্রামের সেই হতদরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে।নিহতদের মধ্যে ১) জজ মিয়া ছিল আলমসাধুর চালক। ভূমিহীন জজমিয়ার রয়েছে ফাহাদ ও টুম্পা নামে ছোট ২ছেলেমেয়ে। ঘটনার পর প্রাপ্ত সকল টাকা জজের মা পুত্রবধূর হাতে তুলে দেয়। আর সেই সুযোগে পুত্রবধূ লক্ষাধিক টাকাও অন্যান্য মালামাল নিয়ে বৃদ্ধা শ্বাশুড়ী ও ২ শিশুসন্তানকে রেখে কেটে পড়ে এবং অন্যত্র বিয়ে করে সংসার শুরু করে। বৃদ্ধা দাদী এখন ২ নাবালক নাতি নিয়ে ভাইয়ের বাড়ীতে থাকে এবং চুল প্রসেসিংয়ের কাজ করে কোন রকমে দিনাতিপাত করছে। ২) নিহত শান্ত ও তার বাবা দুজনেই গাড়ীতে থাকলেও শান্ত ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। বাবা মারাত্মক আহত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি করা হলে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে বর্তমান কিছুটা সুস্থ হয়েছেন। তার মাথায় রয়েছে ১২৩ টি সেলাই, দু’পায়ে রড লাগানো থাকলেও অর্থাভাবে আজও বের করতে পারেননি। এদিকে সেই সময় প্রাপ্ত সাহায্য অন্যান্য টাকা দিয়ে শান্তর সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে দেড়লাখ টাকার বিনিময়ে বিদায় করতে হয়েছে। বর্তমানে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে দিনমুজুর গাজীউর কোন রকমে দিন কাটাচ্ছেন।৩) নিহত রফিকুল ইসলাম এর রয়েছে ৩ মেয়ে। এর মধ্যে ২ মেয়ে বিবাহিত। ছোট মেয়ে স্থানীয় কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী। রফিকুলের স্ত্রী আলীমুন্নেছার বিধবা কার্ড হওয়ায় কোন প্রকারে দিন চলে যায়।


৪) নিহত হাফিজুল ইসলাম এর রয়েছে রাকিব ও সিয়াম নামে ২ ছেলে। এর মধ্যে সিয়াম প্রতিবন্ধী। স্ত্রী বিধবা ভাতা আর নিজে কাজ করে কোন রকমে দিনাতিপাত করে। ছেলে রাকিব এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। মেধাবী এই শিক্ষাথর্ীর ফরম পূরনের টাকা এখনও জোগাড় হয়নি।৫) নিহত আকুব্বারের রয়েছে বিধবা স্ত্রী ,১ ছেলে ও ১ মেয়ে। স্ত্রী চুল প্রসেসিংয়ের কাজ করে কোন প্রকারে সংসার চালায়। তার কপালে আজও বিধবাভাতা জোটেনি।৬) নিহত লালচাঁদের রয়েছে ২ ছেলে। তারা মাঠে শ্রমিকের কাজ করে। স্ত্রী আজও বিধবাভাতা পায়নি।৭) নিহত নজির আহমেদ এর পরিবার একমাত্র ভাগ্যবান। কারন তার ছেলের ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীতে চাকুরী হয়েছে।৮) নিহত ইজ্জত আলীর রয়েছে ১ ছেলে ও ১ মেয়ে। মেয়েটির ইতিমধ্যেই বিয়ে হয়েছে। ছেলেটি শ্রমিক। স্ত্রী আজও বিধবাভাতা পায়নি।৯) নিহত ভোলাই মন্ডলের ছেলে বিল্লালের রয়েছে সারজান ও সোহান নামে ২ সন্তান। এর মধ্যে পুত্র সোহান (১৫) বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। তার বিধবা স্ত্রীর আজ বিধবাভাতা জোটেনি। অন্যের কাজ করে সংসার চলে।১০) নিহত আবদার আলীর রয়েছে ২ মেয়ে ও ছেলে। ছেলেটি বর্তমানে রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজ করে। তার স্ত্রীর বিধবা ভাতা জোটেনি।


১১) নিহত ঠান্ডু মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেনের রয়েছে ১ ছেলে ও ১ মেয়ে। মেয়েটির বিয়ে হলেও ছেলেটি ৭ম শ্রেণীতে পড়ে।
আয়ের তেমন কোন উৎস নেই, তাই নিদারুন কষ্টে দিন কাটে।স্ত্রীর ভাগ্যেও বিধবাভাতা জোটেনি।১২) নিহত শাহিন আলী অবিবাহিত ছিল। জীর্ণ কুঠিরে তার বৃদ্ধা মায়ের সাথে কথা হয়। তারাও তেমন কোন সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত।১৩) নিহত ভূমিহীন শফিকুল ইসলাম বড়বলদিয়ায় ঘরজামাই থাকতো। তার ৩ ছেলেমেয়ের মধ্যে ২টি প্রতিবন্ধী। একটির প্রতিবন্ধী কার্ড হলেও অপরটির হয়নি। তার স্ত্রী জানালেন নিজের জায়গা না থাকায় এখন বাপের বাড়ীতেই থাকেন। সেও বিধবাভাতা পায়নি। সেই সময় একটি সংস্থা তাকে সেলাই মেশিন দিয়েছিল। কাপড় সেলাই করে কোন রকমে আহার জোগাড় করেন। সরকার থেকে তাকে একটি গৃহ দিলে প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে মাথা গোজার একটা ঠঁাই মিলতো।মমার্ন্তিক এই ঘটনার পর সাধারন মানুষ মানবিক সহযোগিতার যে হাত বাড়িয়েছিল তা ছিল অভূতপূর্ব। কিন্তু বাস্তবত সংগত কারনেই সেগুলো স্থায়ী হয়নি। প্রয়োজন ছিল তাদের স্থায়ী ও দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেয়ার। সুযোগ ছিল সকল হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনার। বিশেষ করে ভূমিহীনদের জন্য প্রয়োজন মাথাগোজার ঠঁাই একটি ঘর। যেগুলো করা সহজ হলেও অনেক পরিবার তা থেকে এখনও বঞ্চিত। তবে দর্শনা পুরাতন বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কিবরিয়া আজম নিহত হাফিজুলের পুত্র মেধাবী ছাত্র রাকিবের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরনের প্রয়োজনীয় টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মমার্ন্তিক এই ঘটনায় বির্পযস্ত পরিবারগুলো যেন সকলের সহযোগীতায় জীবনের মূলস্রোতে ফিরে আসতে পারে আজকের দিনে এটাই সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের নিকট আমাদের প্রত্যাশা।উল্লেখ্য গত ২৬ মার্চ দামুড়হুদার জয়রামপুরে ঘটেছিলো স্মরণকালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। একই গ্রামের ১৩ জনের মৃত্যু ও ১২ জন আহতের ঘটনাটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও সকালে আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জের রাস্তাা নির্মাণ কাজের উদ্দ্যেশে ২৪ জন শ্রমিক নিয়ে আলমসাধুযোগে যাবার সময় চুয়াডাঙ্গা-দর্শনা সড়কের জয়রামপুর স্কুল বটতলা নামক স্থানে বিপরীত দিক থেকে সিলেটি বালি ভর্তি দ্রুতগতিতে আসা একটি ট্রাক (চুয়াডাঙ্গা-ট-১১-০৫৮৮) সজোরো মুখোমুখি ধাক্কা দেয়। এতে আলসসাধু দুমড়ে মুচড়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ও পিচ রাস্তায় আচড়ে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় ৮ জন। হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায় আরও ৫ জন। ঘটনাটি গোটা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। হতদরিদ্র নিহত ও আহত পরিবারের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান, বিত্তবানসহ সরকারি-বেসরকাবি বিভিন্ন সংস্থা।ঘটনার ৮ মাস পর হেলপার জুয়েল রানা আদালতে আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ ৮ মাস তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দামুড়হুদা থানার এসআই আমজাদ হোসেন গত ৩০ অক্টোবর রাজিব ও জুয়েলকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। চার্জশিট গ্রহণ করে আদালতের বিজ্ঞ বিচারক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে গত ১৫ জানুয়ারি চালক রাজিবও আদালতে আত্মসমর্পণ করে। আদালত উভয়ের জামিন না মঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *